ধুন্ধুমার! ধুন্ধুমার! ক্ষমতার কুচকাওয়াজ

সারদা, নারদা, উড়ালপুল এবং উপাচার্যকে ছাত্রনেতার ধাক্কা। সবই অতিচেনা মায়ার খেলা। বাকি সব নাটকও বেশ পরিচিত। লিখলেন

মহাভারতীয় যুদ্ধে বিপক্ষ তক্ষক-জড়ানো বাণ ছুঁড়ছে দেখে কৃষ্ণ তাঁর রথটিকে মাটিতে সামান্য দাবিয়ে দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল অর্জুনকে বাঁচানো। বাংলার নির্বাচনী যুদ্ধে দলকে বাঁচাতে কৃষ্ণ তথা পার্থ কী করবেন, বোঝা কঠিন। দল যখন সারদার কৃপায় মুহ্যমান, তখন তিনি বলেছেন, ‘সব ঝুট হ্যায়’। পার্থ বোধহয় জানেন না, ঝুট বললেই সব ঝুট হয়ে যায় না। পার্থের আরেক রূপ মদনগোপাল। তিনি কেন তবে জেলে? জেল থেকে ভোটে দাঁড়ানোর ব্যাপারটি দলকে আরেক রকম কৃষ্ণকথার অনুসঙ্গে ভাবাচ্ছে কি না, দেখতে হবে। কংসের কারাগার আর আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার এক নয়। দেবকীকে কংস কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন। সারদার পাকেচক্রে মমতার সততা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হবে কি না, কে জানে! অজিত পাণ্ডে একসময় গাইতেন—‘কৃষ্ণকে কি কংস-কারায় বেঁধে রাখা যায়’। কামারহাটিতে ফুল ফুটছে—দেবীবাহিনীর বাণী ছুটছে—মদনকে কি কারাগারে বেঁধে রাখা যায? দুর্ভাগ্য! প্যারোলে মুক্তি পাচ্ছেন না মদনগোপাল। এমনই ভবিতব্য!

পার্থ এখন সামলাচ্ছেন নারদ-হুলের খোঁচা। বলছেন, এসব কথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা বাংলার ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি জানেন না। ঠিকই, এই বাংলায় সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, সুভাষচন্দ্র, বাঘা যতীনেরা জন্মেছেন। আর এখন নেতারা টাকা গোছাচ্ছেন, তোয়ালে দিয়ে ঢাকছেন আর আধো-আধো উচ্চারণে জানতে চাইছেন—ডলারের কী হল! বাংলার ইতিহাসের এমন সব মানুষের হয়ে মহাসচিব পার্থ তো অমন কথা বলবেনই!

এরই মধ্যে ঘটে গেল হাওয়াই-সেতুর পতন। পোস্তার বিবেকানন্দ উড়ালপুল ভেঙে পড়ল। সেনাবাহিনী ডাকতে ডাকতে বেলা গেল। যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, এত দেরি করলেন কেন মহামহিমেরা? নিজেরা যে উদ্ধার করতে পারবেন না, এত দেরিতে বুঝতে পারলেন কেন? ওই তিন-চার ঘন্টায় সেনাবাহিনী এলে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু কি ঠেকানো যেত না? দেবী এসে সব সামলে দেবেন ভেবে খামোখা দেরি করলেন! দলনেত্রী এলেন। সেতুর নীচে চাপা পড়া মৃতদের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করলেন। অর্থাৎ, নেতারা যে অঙ্কের টাকা নেওয়াটাকে ‘ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ’ করার মতো ভাবেন, সেই অঙ্কের টাকাটাই হল ইঁদুরের মতো পিষে মারা যাওয়া মানুষের জীবনের মূল্য! বলিহারি! বাংলার ইতিহাস-ভূগোল আর সংস্কৃতির এমন পার্থেনিয়াম-সংস্করণ অচিন্ত্যনীয়!

বড়িশা বিবেকানন্দ মহিলা মহাবিশ্ববিদ্যালয়ে ধাক্কা খেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুগত মারজিত। কারণ, দাবি উঠেছিল—৬০০ নম্বরের মধ্যে ৬৮ পাওয়া ছাত্রীদের পরীক্ষায় বসার অনুমতি দিতে হবে! এ রকম হলে তো ঢালাও ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন হয়! শিক্ষামন্ত্রী পার্থবাবুর প্রিয় উপাচার্য সুগত মারজিত সায় দেননি। অথচ তিনি তো প্রকাশ্যেই নিজেকে শাসকদলের প্রিয় মানুষ বলে দাবি করেছিলেন! কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচে যে শোভা পাচ্ছে দেবীর চিত্রপট, সে তো তাঁরই সৌজন্যে! শহরে সর্বত্র সুলভ শৌচালয়গুলি যাঁর অনুপ্রেরণায় ঝলমল করছে, শিক্ষাঙ্গনে তাঁর প্রতাপ ও আনুগত্যের মমতা-ক্ষমতাকে অস্বীকার করে কে? কার ঘাড়ে ক’টা মাথা! আর এই অবস্থায় অনুপ্রাণিত পড়ুয়ারা যদি উপাচার্যকে ধাক্কা দেন, তাতে কার কী বলার আছে? ও সব ধাক্কা গায়ে পড়েনি। মায়াবাদী ব্যাখ্যায় পড়েছে উপাচার্যের জামায়। জামা বদলে নিলেই হয়! আত্মায় তো ধুলো জমেনি!

পরে শোনা গেল, সাত কিলোমিটার দূরের একটি মহাবিদ্যালয় থেকে নাকি এসেছিলেন ওঁরা। সেই মহাবিদ্যালয়ের সংসদের নেত্রী তাঁরা—তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দামাল নেত্রী! তাঁরা এসেছিলেন; কারণ, বড়িশার কলেজটিতে কোনও ছাত্রসংসদ নেই। সেখানে মেয়েরা রাজনীতি না-করে সাধারণ ছাত্রী-প্রতিনিধি নিয়ে কাজ চালায়। এ তো তাজ্জব কথা! খোদ শিক্ষামন্ত্রীর ভোটকেন্দ্রে এ সব করার কোনও মানে হয়! তাই বোধ হয় ছাত্রীদের এই ‘পরিবর্তনযাত্রা’। ওঁরা চান, পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃণমূলের ঘাসফুল ফুটুক এবং অন্য কোনও ফুল, ফল, শাক, সবজির চাষের দরকার নেই।

চমৎকার শিক্ষানীতি।

পার্থবাবুকে তাই রথের চাকা মাটিতে দাবিয়ে দিতেই হল। তক্ষকরূপী সমালোচনার বাণে মুকুট সামান্য ঝলসে গেল, এই যা!

কিন্তু ভোটের মাঝে রথের চাকা মাটিতে বসে যাওয়াও কাজের কথা নয়। জনগণকেও তো কিছু বোঝাতে হবে! তাই ওই ছাত্রীদের সাময়িকভাবে সাসপেণ্ড করা হয়েছে। একদা যেমন সাসপেণ্ড করা হয়েছিল আরাবুলদেরও। প্রয়োজন মতো ঠিক আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয় তাঁদের। ‘তাজা সৈনিক’ বলে কথা!

কোনও কোনও বিশিষ্টজন হাতা গুটিয়ে বলছেন, উপাচার্যদের ধাক্কা দেওয়া নতুন কিছু নয়।

ঠিকই। নতুন তো নয়ই! সন্তোষ ভট্টাচার্যের লাঞ্ছনা কি আমরা ভুলে গিয়েছি? তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনের পর দিন যে অপমান সহ্য করতে হয়েছিল, তা আমরা ভুলিনি। বাংলায় শিক্ষাক্ষেত্রে ওই আধিপত্যবাদ, ওই হুকুমদারি আমাদের পছন্দ ছিল না। আমাদের মনে আছে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কক্ষে এক ছাত্রনেতাকে ছুরি মেরে খুন করা হয়েছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ছুরি মেরে কানাডা-স্থিত হয়েছিল এক উগ্র ছাত্রনেতা। এ সব খুব খারাপ বলেই তো আমরা ২০১১ সালে পরিবর্তন চেয়েছিলাম! সেই পরিবর্তনের যে ছবি দেখা গেল, তা তো আরও ভয়ঙ্কর!

পাদরিদের ভয়ে গ্যালিলিও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। কিন্তু তাতে বাস্তব বদলে যায়নি। পৃথিবীই ঘুরছে। ঘুরতেই থাকবে। গা-জোয়ারি, দখলদারি, হুকুমদারি করে ভোটে জিতলেও চুরি চুরিই থেকে যাবে। হাজারো আশা-আকাঙ্ক্ষার পরেও শিক্ষাক্ষেত্রে অনাচার পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়েই থেকে যাবে।

(লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য)