হোক না বিতর্ক, এ সিদ্ধান্ত দিশাও তো দেখায়

প্রবীণ তোগারিয়ার তুমুল কান্না এবং এনকাউন্টারে ‘খতম’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্যেই হজের উপর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের ভর্তুকি প্রত্যাহারের ঘোষণাটি এল। তার আগেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক কার্যনির্বাহী সভাপতি চোখের জল মুছতে মুছতে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি রাম মন্দির নির্মাণ এবং গোরক্ষার বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরতে চান বলেই তাঁকে ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু হিন্দুত্বের এই স্বঘোষিত অবিভাবককে কেই বা খাস গুজরাটে ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে? প্রবীন তোগারিয়ার নিশানা যদি গুজরাটের রাজনীতিতে এবং সঙ্ঘ পরিবারের অভ্যন্তরিন রাজনীতিতে তাঁর এক নম্বর শত্রু বলে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হন, তাহলে কিনা বিশ্বাস করে নিতে হয় উগ্র হিন্দুত্বের বড় মুখকে চুপ করিয়ে দিতে চাইছেন মোদী-অমিত শাহ জুটি? ঠিক এই সময়েই কেন্দ্রীয় সরকারের সংখ্যালঘু দফতরের মন্ত্রী হিসাবে মুক্তার আব্বাস নাকভি হজের উপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার ঘোষণা করলেন। মনে রাখা দরকার, এই ভর্তুকি তুলে দেওয়ার জন্য এত দিন ধরে প্রবীন তোগারিয়া এবং অন্য হিন্দুত্ববাদীরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

সঙ্ঘের প্রচারক হিসাবে কোন এক সময়ে নাকি একই স্কুটারে চেপে প্রবীণ তোগারিয়া এবং নরেন্দ্র মোদী গুজরাট চষে বেড়াতেন। সেই সময় থেকেই দু’জনের ‘সখ্য’-এর শুরু। এক দু’চাকায় সওয়ারি দুই বন্ধুর সেই সখ্যতার আখ্যান একসময় প্রায় ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি ছোড়েঙ্গে’ এর মতোই ‘মিথ’ ছিল। সেই বন্ধুত্ব ভেঙে কিভাবে নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, এবং ধাপে ধাপে একেবারে দিল্লির কুর্সিতে বসলেন তা প্রবীণ তোগারিয়া জন্তানিতে অনেককেই বলে থাকেন। কিন্তু ইতিহাসের কি আশ্চর্য সমাপতন দেখুন, নরেন্দ্র মোদীর সরকার যেদিন তথাকথিত ‘মুসলিম তোষণ’এর পথ ছেড়ে হজ থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন, ঠিক সেই দিনই প্রবীণ তোগারিয়াকে সেই ঘোষণাকে উৎযাপনের পরিবর্তে হার্দিক প্যাটেলের বাড়িয়ে দেওয়া রুমালে চোখের জল মুছতে হচ্ছে। গুজরাটের রাজনীতিকে মোদীর কট্টর বিরোধী বলে পরিচিত হার্দিক প্যাটেলের সহানুভূতির উত্তরে প্রবীণ তোগারিয়া ‘ইয়ে দোস্ত দোস্ত না রহা’ গাইছিলেন কিনা জানা নেই।

রসিকতা থাক। হজের উপর থেকে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত এই ২০১৮ সালে এসে শেষ পর্যন্ত মোদী সরকার ঘোষণা করলো, তা আসলে কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই। এবং ২০১২ সালে যখন সুপ্রিম কোর্ট সেই নির্দেশ দিয়েছিল, তখন কিন্তু একেবারে কোরাণ উদ্ধৃত করেই সেই নির্দেশ শোনানো হয়েছিল। ২০১২ এর ৮ই মে বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই এবং আফতাব আলম তাঁদের নির্দেশ দেওয়ার সময় কোরাণের ৩ নং সুরার ৯৭ নং আয়াৎ  উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, যাঁদের হজে যাওয়ার সাধ্য আছে, ইসলাম অনুযায়ী তাঁদেরই হজে যাওয়া উচিত। এবং সেই কারণেই ভারতবর্ষ থেকে যে মুসলিমরা হজে যান, তাঁদের যাতায়াতের জন্য কোনরকম ভর্তুকি কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া উচিত নয়। সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সেই রায়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকারকে এই ভর্তুকি পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এবং ২০২২ সাল ছিল সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারণ করে দেওয়া সময়সীমা। তার ঠিক ৪ বছর আগে, ২০১৮ সালেই নরেন্দ্র মোদীর সরকার জানিয়ে দিল, তারা আর হজ যাত্রীদের কোনরকম ভর্তুকি দেবে না। মুক্তার আব্বাস নাকভির ঘোষণা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার এতদিন যে অর্থ হজে ভর্তুকির জন্য ব্যয় করতো সেই অর্থ এবার থেকে মুসলিমদের শিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হবে। বিশেষ করে এই অর্থ ব্যবহৃত হবে মুসলিম মহিলাদের শিক্ষার জন্য।

কেন্দ্রীয় সরকারের এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিমদের স্বঘোষিত অবিভাবকরা নেমে পড়েছেন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায়। এমআইএম নেতা আর্শাদউদ্দিন ওয়াইসি তো বলেই দিয়েছেন, কোনদিনই এই ভর্তুকি হজ যাত্রীদের কাজে লাগতো না, আসলে এই অর্থ যেত সরকারি বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার পকেটে। কারণ, বিমান ভাড়া বাবদ কেন্দ্রের সংখ্যালঘু মন্ত্রক এই টাকা অসামরিক বিমান পরিবহণ দফতরের হাতে তুলে দিত। ওয়াইসি বা অন্য তথাকথিত মুসলিম নেতাদের এই যুক্তি হাস্যকর। ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারের দাখিল করা হলফনামায় বলা হয়েছিল, ‘নিয়ম অনুযায়ী বিমান সংস্থাগুলিকে তীর্থযাত্রীদের নিয়ে জেড্ডা অবধি যেতে হয় এবং সেখান থেকে খালি ফিরে আসতে হয়। সেই জন্যই এমনি সময় জেড্ডা পর্যন্ত যে বিমানভাড়া ভারতীয় টাকায় ২৫ হাজার পড়তো, তাই হজের সময় অনেক বেড়ে যায়।’ মোদী সরকার নয়, ২০১১ সালে মনমোহন সিং এর সরকারই সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছিল,  হজের জন্য প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে বিমান ভাড়া বাবদ ১৬ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল, প্রত্যেক হজ যাত্রী পিছু বাড়তি ৩৮ হাজার টাকা কেন্দ্রীয় সরকারকে দিতে হয়েছিল।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৫ বছরে ভারতবর্ষ থেকে হজ যাত্রীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ১৯৯৪ সালে যেখানে মাত্র ২১০৩৫ জন হজে গিয়েছিলেন, সেখানে ২০১১ সালে ১ লক্ষ ২৫ হাজার মুসলিম হজে যান। ১৯৯৪ তে যেখানে প্রতিজন হজযাত্রী পিছু খরচ ছিল মাত্র ১৭০০ টাকা, সেটাই ২০১১ সালে গিয়ে হয়ে দাড়ায় ৫৪৮০০ টাকা। তারই ফলস্বরুপ ১৯৯৪ সালে যেখানে হজের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতো ১০ কোটি ৫১ লক্ষ টাকা, সেটাই ২০১১ তে বেড়ে দাড়ায় ৬৮৫ কোটি টাকা। এবং সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামায় মনমোহন সিং এর সরকারই পরিষ্কার জানিয়েছিল যে হজের সময় বিমান ভাড়া যে বেড়ে যায় তাই নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে কোনও লাভ নেই। কারণ, সৌদি আরব যে নিয়ম নির্ধারণ করে দেয়, সেই নিয়ম মানতে গিয়েই বিমানের ভাড়া অনেক বেড়ে যায়।

মনে রাখতে হবে, শুধু প্রবীণ তোগারিয়ার মতো হিন্দুত্ববাদীরা শুধু নন, এমনকি সৈয়দ সাহাবুদ্দিনের মতো কট্টর মুসলিম নেতারাও হজের উপর থেকে ভর্তুকি তুলে দেওয়ার জন্য সওয়াল করে আসছিলেন। কেউ যদি ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ দেওয়ার সময় কেন্দ্রীয় সরকারের দাখিল করা বিভিন্ন পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন এই হজের ভর্তুকির নামে আসলে কাদের তোষণ করা হচ্ছিল। অনেকেই হয়তো জানেন না প্রায় প্রতি বছরই কেন্দ্রের ঠিক করে দেওয়া ‘ভিআইপি’, ‘ভিভিআইপি’ এবং বিশেষ অতিথি, এই তকমায় ৩ হাজার জনকে সরকারি পয়সায় হজ করার সুযোগ করে দেওয়া হতো। এই ৩ হাজার জনের মধ্যে অনেক সরকারি কর্মী এবং রাজনৈতিক নেতাও থাকতেন। জনগনের করের টাকায় এইভাবে হজ করার সুযোগ পেয়েছেন অনেকেই। মোদী সরকারের ঘোষণার পর যাঁরা এই ভর্তুকি তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব হয়েছেন, তাঁরা কিন্তু কেউ বলছেন না কেন সাধারণ হজ যাত্রীদের টপকে, লটারি এড়িয়ে একদল ‘বিশেষ সুবিধাভোগী’কে হজ যাত্রার ‘দাক্ষিণ্য’ দেওয়া হতো কেন্দ্রীয় হজ কমিটি, সংখ্যালঘু দফতর বা মন্ত্রীদের কোটা থেকে।

মুসলিম মহিলাদের ‘মেহেরাম’ ছাড়া হজ যাত্রার সুপারিশ যখন এল, তখন থেকেই আমরা, তথাকথিত কিছু ‘বেয়াদপ’ মুসলিম মহিলা এই অধিকার আদায়ের দাবিতে সরব ছিলাম। এবং ‘তিন তালাক’ থেকে শুরু করে মুসলিম মহিলাদের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের দাবিতে যখনই আমরা রাস্তায় নেমেছি, তখনই আমাদের শুনতে হয়েছে, আসলে তো আমরা ‘মুসলিম’ই নই! এই হজ নিয়ে যখন নিজের বক্তব্য লিখছি, তখনও জানি শুনতে হবে আমরা হজ যাত্রার কি বুঝি? তাই আবার জোর গলায় এবং স্পষ্টভাবে বলে রাখি, আমার নিকট আত্মীয়রা হজে গিয়েছেন। গত বছরও আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া হজ করে এসেছেন। এবং সেই জন্যই আমি মনে করি, কারও হজের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার কোনও কারণ নেই। ২০১২ সালের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যেটা বলা হয়েছিল, ইসলাম অনুযায়ী সেটাই ঠিক কথা। কোরাণ বলছে, যার সাধ্য আছে, সে নিজের সাধ্য অনুযায়ী হজে যেতে পারে।

মুক্তার আব্বাস নাকভি কেন্দ্রীয় সরকারের মুখপাত্র হিসাবে যেটা বলেছেন, হজে ভর্তুকি বাবদ এতদিন যে অর্থ ব্যয় করা হতো, এবার সেটা ব্যবহার করা হবে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার জন্য, তাও যথেষ্ঠ আশাব্যঞ্জক। হতে পারে রাজনীতি, হতে পারে মুসলিম মেয়েদের নিজেদের দিকে টানার আপ্রাণ চেষ্টা, কিন্তু এটা বুঝতে অসুবিধা নেই, নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর সরকার মুসলিম মেয়েদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সেই কারণেই প্রথমেই ‘তিন তালাক’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে লড়ে যাওয়া থেকে বিল আনা, তারপরে ‘মেহেরাম’ ছাড়া ৪৫ উর্দ্ধ মুসলিম মহিলাদের হজে যাওয়ার অধিকার দেওয়া এবং এবার হজে ভর্তুকির টাকায় মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার কর্মসূচী নেওয়ার মধ্যে একটা ‘রোডম্যাপ’ আছে।

গত ২০ বছরে মহিলাদের, বিশেষ করে মুসলিম মহিলাদের নিয়ে কাজ করা এবং কিছুটা হলেও আন্দোলন করার পরিপ্রেক্ষিতে আমি এবার তাকিয়ে আছি মোদী সরকারের পরবর্তী চমকের দিকে। আমি যতটুকু বুঝি এবং গত তিন বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্মকে বিশ্লেষণ করেছি, তাতে মনে হয় এর পরের ঘোষণাটা মোদী মেয়েদের সবচেয়ে জরুরি সমস্যা, স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে করে দেবেন না তো? মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রী এবং কংগ্রেস সাংসদ সুস্মিতা দেব স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর থেকে জিএসটি তুলে নেওয়ার জন্য সই সংগ্রহে নেমেছিলেন। আরও অনেকের মতো আমিও সেখানে সই করেছিলাম। কারণ যাঁরা মুসলিম মেয়েদের কথা জানেন, তাঁরা জানেন মুসলিম মেয়েদের সুস্বাস্থ্যের জন্য স্যানিটারি ন্যপকিনের যোগান কতটা জরুরি। মুসলিম মেয়েরা যে জরায়ুর ক্যনসারে ভোগেন, তার অনেকটাই হয় এই স্যানিটারি ন্যাপকিনের অভাবে। অক্ষয় কুমারের ‘প্যাডম্যান’ মোদী সরকারের মহিলাদের জন্য কোনও নতুন ঘোষণার অনুঘটক হিসাবে আসছে না তো?