স্মরণে বরণে প্রফুল্লাচার্য

পৃথিবী জুড়ে যখন করোনা বা কোভিড নাইন্টিন ভাইরাসের মহামারী তাণ্ডব চলছে, ভয়ে আতঙ্কে মানুষ দিশেহারা, ঠিক সেই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট্‌, ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে করোনা মোকাবিলার জন্য সাহায্য হিসাবে চেয়ে পাঠিয়েছেন “হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন” নামক একটি ড্রাগ। এক সময় বাংলার আতঙ্কসৃষ্টিকারী ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য যাকে বিশল্যকরণী হিসাবে প্রয়োগ করা হত। ভারতসরকার সেই ড্রাগ প্রস্তুতি ও জোগানের জন্য যাদের বরাত দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম পশ্চিমবাংলার “বেঙ্গল কেমিকেল্‌স্‌ অ্যান্ড ফার্মাস্যুটিক্যাল্‌স্‌”। যে প্রতিষ্ঠানটির কথা বলতেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে এসে যায়, যুগপুরুষ, এক মহান বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কথা।

বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ সাধক, ভারতীয় রসায়নবিজ্ঞানের জনক, ছাত্রদরদী এক অসাধারণ স্নেহশীল আদর্শ শিক্ষক, বিজ্ঞান সাধক, দেশপ্রেমিক, দেশহিতৈষী, আত্মনির্ভরতার প্রতীক এই বিজ্ঞানী বাঙালীকে স্বনির্ভর এক জাতি হিসেবে গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, এবং তারই ফলশ্রুতি, তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “বেঙ্গল কেমিক্যাল্‌স্‌” এর।

আমাদের দেশে প্রতিভা, মেধা, জ্ঞানের অভাব কখনো ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা পরাধীন যুগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সাত দশক পরেও সেই প্রতিভাগুলির বিকাশ, পরিচর্যা, ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শিক্ষাখাতে বরাদ্দ এতই কম হয়েছে যে, যার জন্য এদেশের মেধাসম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে – সেইসব দেশের উন্নয়ন ও গবেষণার কাজে ভাড়া খাটতে। এ বড়ই বেদনার কাহিনী। অথচ এদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, বিজ্ঞান, গোটা পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে রাখার শক্তি রাখে।  

আজ থেকে প্রায় ২৫০ বছর আগে ইংরাজির ১৮৬১ র ২রা আগস্ট্‌ অবিভক্ত ভারত তথা বাংলার খুলনা জেলার রাড়ুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এদেশের আধুনিক রসায়নবিদ্যার জনক, যুগপুরুষ প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বিজ্ঞান ও টেকনোলজির প্রভূত বিকাশ ও উন্নয়নের মধ্যে নিহিত আছে বাঙালী তথা ভারতবাসীর আত্মনির্ভরতার মূলমন্ত্র। তাঁর চিন্তন, মনন, দর্শন, অন্বেষা, ও কর্মধারা এখনো আমাদের বিস্ময়াবিষ্ট ও অভিভূত করে রাখে।

পড়াশুনার জন্য গ্রামের বাড়ি থেকে কোলকাতায় এসে, হেয়ার স্কুলে এনং সেখান থেকে মেট্রোপলিটন কলেজ হয়ে প্রেসিডেন্সি থেকে ইংলন্ডের এডিন্‌বার্গ্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসিতে ভর্তি হন ১৮৮২ সালে। সেখান থেকে ১৮৮৭তে তিনি ডিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৮৮তে তিনি কোলকাতায় ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন। ১৮৯৪তে তাঁর দ্বিতীয় গবেষণাপত্র এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। প্রথমে তিনি সর্ষের তেল ও ঘি তে ভেজাল অনুসন্ধান ও দেশবাসীর ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা মাথায় রেখে ওষুধ, সাবান, ফিনাইল ও প্রসাধনী সামগ্রী উৎপন্নের কথা ভাবেন। ১৮৯৫ এ স্কুল অফ কেমিস্ট্রি স্থাপনের মাধ্যমে ভারতীয় রসায়নবিদ্যার জনম হিসাবে পরিচিত হলেন। অতঃপর তিনি শুরু করলেন কিছু দুর্লভ ভারতীয় খনিজ পদার্থ নিয়ে গবেষণা। এবং আবিষ্কার করে ফেললেন “মার্কিউরাস নাইট্রাইট” নামক যৌগটি। এরপর তিনি আরো অনেকগুলি ধাতুর নাইট্রাইট আবিষ্কার করে “মাস্টার অফ নাইট্রাইট্‌স্‌” হিসেবে অভিহিত হলেন। তাঁর শতাধিক গবেষণাপত্রের মধ্যে ৬০ এর অধিক নাইট্রাইট বিষয়ে। তাঁর শেষ গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে তা৬র ৭৫ বছর বয়সে। তিনিই ভারতের প্রথম সার্থক রসায়নবিদ। তিনি একজন দেশপ্রেমী ছিলেন। গোপনে বিপ্লবীদের অস্ত্র কেনার জন্য অর্থ সাহায্য করতেন। দেশাত্মবোধক গান লিখতেন। তিনি বলতেন, “বিজ্ঞান গবেষণার জন্য অপেক্ষা করা চলে, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য অপেক্ষা চলে না”। ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল্‌স্‌ ও ফার্মাস্যুটিক্যাল্‌স্‌’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পায়নের প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রকাশিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে। বিজ্ঞান গবেষণা ও নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে ভারত আবার জাগবে। বিশ্বসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করবে। মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীদের আচার্য – সেই মহামানবকে প্রণাম।