শ্যামাপ্রসাদ, বঙ্কিমচন্দ্রকে ভুলিয়ে দেওয়া আসলে গান্ধী পরিবারের ‘চক্রান্ত’, বামেরা তার দোসর

নেতাজীর সময় থেকেই দেশভাগেও নেহেরুর বাঙালি বিদ্বেষই বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

ইতিহাসের একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমি এই লেখাটা লিখছি। একদিকে যেমন পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে ‘বাংলা’ করে দেশভাগের স্মৃতি এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে অসমের এনআরসি নিয়ে ‘হিন্দু বাঙালি’কে অযথা আতঙ্কিত করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঠিক যে সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে আরও বেশি করে স্মরণ করার প্রয়োজন, বাঙালি জাতির জন্য তাঁর যে অবদান, তাকে আরও বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার, তখনই আবার নতুন করে ‘চক্রান্ত’ শুরু হয়েছে।

এই পুরোটাই হচ্ছে গান্ধী-নেহেরু পরিবারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যাঁরা কখনই চাননি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্য যে সব অবিস্মরণীয় চরিত্রগুলি, তাঁদের সম্পর্কে মানুষ জানুক, ভারতবাসী তাঁদের শ্রদ্ধা করতে শিখুক। আর নেহেরু গান্ধী পরিবারের এই ‘মহৎ পরিকল্পনা’য় বারে বারে মদত জুগিয়ে এসেছেন ভারতবর্ষের বামপন্থীরা। নেহেরু পরিবারের অঙ্গুলিহেলনে ইতিহাস লিখতে গিয়ে এঁরা শ্যামাপ্রসাদকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়েছেন, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বা এমন কি রমেশচন্দ্র মজুমদার, যদুনাথ সরকারের মতো ইতিহাসবিদদেরও এরা বাঙালির মনন এবং চিন্তা থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

আমি একটা পুরানো বই উল্লেখ করে নেহেরু এবং গান্ধী পরিবার আসলে বাঙালিদের কি চোখে দেখতেন, সেটা বোঝাতে চাই। প্রফুল্ল চক্রবর্তীর বিখ্যাত বই ‘দ্যা মার্জিনাল মেইল’ যদি কেউ পড়েন, তাহলে দেখতে পাবেন শ্রীহট্ট বা সিলেট যাতে ভারতবর্ষে না এসে পাকিস্তানে যায়, সেইজন্য নেহরুর কি ভূমিকা ছিল। শ্রীহট্ট যদি ভারতবর্ষে থাকতো, তাহলে উত্তর-পূর্ব ভারতে আর একটি বাঙালি প্রধান রাজ্য তৈরি হতো। কিন্তু নেহেরু সেটা চাননি বলেই উত্তর-পূর্ব ভারতে বাঙালিরা ‘সংখ্যালঘু’ হয়ে রয়ে গেল। প্রফুল্ল চক্রবর্তী খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, হিন্দু বাঙালিদের প্রতি, আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, পূর্ববঙ্গের হিন্দু বাঙালিদের প্রতি নেহেরুর একটা রাগ ছিল। এবং সেই কারণেই তিনি চাননি, পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ভারতবর্ষে আর একটি বাঙালি প্রভাবিত রাজ্য থাকুক।

গান্ধীজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভী সিতারামাইয়াকে নেতাজী হারিয়ে দেওয়ার পর থেকেই কংগ্রেসের মধ্যে বাঙালিদের কোনঠাসা করে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, নেহেরু তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তারই ফলে দেশভাগের সময় কংগ্রেস এবং নেহেরু বাঙালিদের বিপক্ষে গিয়েই সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। লক্ষ্য করে দেখবেন, বাঙালি হিন্দুদের ক্ষেত্রে তিনি কখনও ‘পুণর্বাসন’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, বারবার ত্রাণ দেওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ পূর্ব বাংলা থেকে যেসব হিন্দু ভারতবর্ষে চলে এলেন, তারা যাতে ভারতবর্ষে সামাজিক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা না পান, সেটাই নেহেরুর প্রধান লক্ষ্য ছিল। আর নেহেরুর এই পরিকল্পনায়, ‘বাঙালি বিরোধিতা’র পথে যিনি পর্বতের মতো প্রতিরোধ করেছিলেন, তিনিই শ্যাপাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আর সেইজন্যেই শ্যামাপ্রসাদকে বিভিন্ন তকমা লাগিয়ে আমাদের থেকে, বাঙালিদের থেকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

তৃণমূল সাংসদ এবং ইতিহাসবিদ বলে পরিচিত সুগত বসু সম্প্রতি বিভিন্ন সাক্ষাতকারে বলেছেন, যে নেহেরু, গান্ধীর সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদকে এক পংক্তিতে বসিয়ে দেশনায়কের মর্যাদা দেওয়া যায় না। মাননীয় সুগত বসু এবং তাঁর পরিবার চিরকাল ‘রাঙাকাকা রাঙাকাকা’ বলে নেতাজীর নাম ভাঙিয়ে আসলে নেহেরু পরিবারের অ্যাজেন্ডাকেই আমাদের গেলানোর চেষ্টা করেছেন। সেইজন্যই সুগতবাবুরা বারবার প্রমাণ  করার চেষ্টা করেন তাইহুকুতে বিমান দূর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু হয়েছিল। এই সবটাই করা একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। ভুলে যাবেন না, সুগত বসুর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়েও যে বই লিখেছেন তাতে মূলত পাকিস্তানপন্থী বা ‘রাজাকার’দের বক্তব্যকেই সমর্থন করেছেন। এবং সেই বই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঘাত করে আসলে পাকিস্তানের স্বার্থকেই পুষ্ট করেছে। তাই ভারতীয় জাতীয়তাবাদে কার ভূমিকা কতটা, সে নিয়ে সুগত বসুদের বিশ্লেষণকে বেশি গুরুত্ব না দেওয়ায় ভালো।

মুস্কিল হচ্ছে সুগত বসুরা শুধু শ্যামাপ্রসাদকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন না, তাঁরা বঙ্কিমচন্দ্রকেও উপেক্ষা করে চলতে চান। তারা আমাদের, মানে বাঙালিদের ভুলিয়ে দিতে চান যে ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’-এর শুরু এই বাংলা থেকে এবং বঙ্কিমচন্দ্রই তার পথপ্রদর্শক। বন্দেমাতরম প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সুগত বসু এত কথা বলেছেন, কিন্তু কেন বললেন না যে রেজাউল করিম বন্দেমাতরম নিয়ে কি বলেছিলেন? কেন বন্দেমাতরম পুরোটা গাওয়া হয় না, সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুগত বসুরা বারবার এটা বলতে ভুলে যান যে ১৯৩০ বা এমনকি ১৯৩৭ অবধিও এই নিয়ে কোনও আপত্তি ওঠেনি। আপত্তি তখন উঠল যখন মুসলিম লিগ এই নিয়ে আপত্তি করলো। রেজাউল করিম কিন্তু পরিষ্কার বলেছেন, বন্দেমাতরম ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভাষা দিয়েছিল। কিন্তু মুসলিম লিগের আপত্তির পরে কংগ্রেস গানটিকে দ্বিখন্ডিত করে গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ, বন্দেমাতরম নিয়ে সাধারণ মুসলিমদের আপত্তি ছিল না, আপত্তি ছিল মুসলিম লিগের। সেই মুসলিম লিগের যারা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে ভাগ করেছিল। কেন সুগত বসু বলছেন না, গানটিকে এইভাবে বিভক্ত করার বিষয় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুও ‘Visibly uncomfortable’ ছিলেন। আর নেহেরু তো ১৯৩৭ এর আগে বন্দেমাতরম পড়েনইনি, ওই বছরই প্রথম পড়লেন এবং তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি ডিকশনারি নিয়ে বন্দেমাতরমের অনুবাদ পড়েছিলেন। তাই আনন্দমঠের কি আবেগ, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি কি, সেগুলো নেহেরু বুঝবেন কি করে?

আসলে ইতিহাসের এই অর্ধসত্য আমাদের দেশের ইতিহাসচর্চায় এবং জাতীয়তাবাদের গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। আমরা এই কারণেই বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে সম্পূর্ণটা জানি না, শ্যামাপ্রসাদকে তো সুকৌশলে ইতিহাস থেকেই মুছে ফেলা হয়েছে। বন্দেমাতরমকে দ্বিখন্ডিত করার বিষয়ে বার বার বলা হচ্ছে যে এটা রবীন্দ্রনাথের অনুমতি নিয়ে করা হয়েছিল, এটা বলা হচ্ছে না, যে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ এবং নেহরেুকে চিঠি লিখেছিলেন। এবং রামানন্দবাবুকে সেই চিঠি লিখতে বলেছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র। আরও মনে রাখবেন রবীন্দ্রনাথ যেমন ব্রাহ্ম ছিলেন এবং মূর্তিপুজাতে বিশ্বাস করতেন না, তেমনি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ও ব্রাহ্ম ছিলেন। বন্দেমাতরমকে ভাগ করা নিয়ে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় এবং শ্রীঅরবিন্দের প্রতিবাদ সেই সময়কার বাঙলায় যে আলোড়ন তুলেছিল, আমাদের ইচ্ছে করে সেটা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

নেতাজীকে নিয়ে অধ্যপক পূরবী রায় যখন বই লিখেছিলেন, সেই বই যাতে বুকস্টোর থেকে বিক্রি না হয়, কোনও পত্রিকায় যাতে সেই বই নিয়ে আলোচনা না হয়, সেই সব চেষ্টা করা হয়েছে। এটাই নেহরেু এবং গান্ধী পরিবারের লক্ষ্য। তারা ইতিহাসকে একপেশে ভাবে চালনা করতে চেয়েছে। এবং সময এসেছে আসল ইতিহাস জানার, সত্যি কথা বলার।