শরিয়া আদালত বাতিল করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত সঠিক, মুসলিম মেয়েদের ভরসা জোগায়

প্রতি জেলায় শরিয়া আদালত তো আসলে ভারতীয় সংবিধানকেই চ্যালেঞ্জ জানানো

shariya-law

২০১৯ এর লোকসভার নির্বাচনের আগে কারা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করতে চাইছে, সেই বিষয়টা পরিস্কার নয়। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড ভারতবর্ষের প্রতিটি জেলায় শরিয়া আদালত শুরু করার যে ঘোষণা করেছিল, তাতে ধর্মীয় মেরুকরণের কাজটা শুরু হয়ে গেল। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের এই চেষ্টা আসলে ভারতবর্ষকে মধ্যযুগে ঠেলে দেওয়ার একটি ‘উদ্যোগ’ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আশার কথা কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড-এর এই ধরনের আদালত বসানোর কোনও ক্ষমতা নেই।

আইনমন্ত্রী পরিষ্কার বলেছেন, সরকার মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড-এর এই উদ্যোগকে কোনওভাবেই সমর্থনও করবে না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, কেন্দ্রীয় সরকার যেই মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড-এর এই উদ্যোগে বাধা দেবে, তখনই তারা ‘ইসলাম খতরে মে হ্যায়’ বা ইসলাম আক্রান্ত, এই প্রচার করে মুসলিমদের একাংশকে খেপাতে চাইবে। এবং বলবে বিজেপির শাসনে ভারতবর্ষে মুসলিমরা এবং তাদের ধর্মাচারণের অধিকার নিরাপদ নয়। লোকসভার নির্বাচনের আগে এই তাস খেলবে বলেই মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এই ধরনের একটি আজগুবি প্রস্তাব সামনে এনেছিল। তারা জানতো, কেন্দ্রীয় সরকার তো বটেই, মুসলিমদের বড় অংশও এই উদ্যোগের বিরোধিতা করবে।

‘তিন তালাক’ বন্ধের দাবিতে মুসলিম মেয়েদের জয়ের পর আমরা যখন মুসলিম নারীর বাকি অধিকারগুলি নিয়ে রাস্তায় নামছি, তখনই মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে আসলে তারা সমাজকে কোন্‌ দিকে ঠেলে দিতে চায়। তারা ধর্মের ভিত্তিতে ভারতীয় সমাজকে ভাগ করতে চায়। এবং মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড-এর এই রাজনীতির পিছনে অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মদতও রয়েছে।

শরিয়া আদালত মানে কি? শরিয়া আইন মেনে বিচার এবং শাস্তি? তাহলে ব্যাভিচারের ক্ষেত্রে পাথর ছুড়ে ছুড়ে দোষীকে হত্যা করা বা চুরির অপরাধে হাত কেটে নেওয়া কি মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড চালু করবে? নাকি এটা শুধুই মুসলিম মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার বা অন্য অর্থনৈতিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আমাদের, মানে মুসলিম মেয়েদের আন্দোলনকে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা?

তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নেওয়া হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলিমদের জন্য তাদের ‘স্বঘোষিত অবিভাবক’ মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড শরিয়া আদালত চালু করতে চায়, তাহলে দেশের অন্য জনগোষ্ঠীরা কি করবে? পাঞ্জাবে কি শিরোমনি গুরুদ্বার অকাল কমিটি জেলায় জেলায় সমস্ত বিবাদ বিসংবাদ বা অপরাধ বিচার করার দায়িত্ব নেবে? বা দেশের উত্তর পূর্বে, যেখানে খ্রিষ্টানরাই অনেক রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে এবার থেকে চার্চ বা ওই রকম কোনও ধর্মীয় সংগঠন আদালত চালাবে? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর এখনও পর্যন্ত মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড-এর কাছ থেকে পাওয়া যায় নি। মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এর হয়ে যিনি সুপ্রিম কোর্টে গলা ফাটিয়েছিলেন, সেই কপিল সিব্বাল বা তাঁর দল কংগ্রেসও চুপ।

যাঁরা তিন তালাক নিয়ে বিজেপি রাজনীতি করছিল বলে অভিযোগ তুলেছিল, সেই সব অন্য রাজনৈতিক দলও মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের  এই নতুন অভিপ্রায় সম্পর্কে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের এই উদ্যোগ তো আসলে ভারতের সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতাকেই চ্যালেঞ্জ করা। যদি ভারতবর্ষের প্রতিটি জেলায় জেলায় আলাদা শরিয়া আদালত শুরু হয়, তাহলে ভারতবর্ষে সংবিধান থাকার আর কি গুরুত্ব থাকবে? মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এবং তার আইনি উপদেষ্টা কপিল সিব্বালরা তাহলে কি আসলে ভারতীয় সংবিধান এবং আইনকে বিশ্বাস করেন না?

খবরের কাগজে দেখলাম, বিজেপির মুখপাত্র এবং সাংসদ মীনাক্ষী লেখি বলেছেন, ভারতবর্ষ ইসলামী প্রজাতন্ত্র নয় যে প্রতিটি জেলায় শরিয়া আদালত চালু হবে। আমার তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি সাংবিধানিক প্রশ্ন আছে। মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডকে দেশের সব মুসলিমের হয়ে কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে? আমি বা আমার মতো অসংখ্য মুসলিম মহিলা, যাঁরা মুসলিম মহিলাদের অধিকার রক্ষার দাবিতেই আন্দোলন করছি, তাঁরা তো মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডকে আমার প্রতিনিধি বলেই স্বীকার করি না। আমাদের জন্য ভারতবর্ষের সংবিধান এবং ভারতীয় আদালতই শেষ কথা।

অনেক কট্টর মুসলিম মৌলবাদীর মতোই মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডও দীর্ঘদিন ধরে তাদের যাবতীয় অদ্ভুত ঘোষণা এবং ‘ফতোয়া’র জন্য সৌদি আরবকে ব্যবহার করে এসেছেন। কিন্তু সম্ভবত মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড জানে না, সৌদি আরবেও এখন সংস্কারের হাওয়া। সৌদি আরবের মহিলাদের গাড়ি চালানোর অধিকার দেওয়ার পরে এখন সেখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনেও আর কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। এমনকি সৌদি আরবে নতুন যে সব বিলাশবহুল রিসর্ট তৈরি করছে, সেখানে বিদেশি মহিলারা এসে বিকিনি পরেই ঘুরে বেড়াতে পারবেন। সৌদি আরবের নতুন যুবরাজ মুসলিম বিশ্বে সংস্কারের যে খোলা হাওয়া নিয়ে আসতে চলেছেন, সম্ভবত তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানে না ভারতীয় মুসলিমদের এই স্বঘোষিত অভিভাবক সংস্থাটি।

কিন্তু আবারও বলছি, দেশের প্রতিটি জেলায় শরিয়া কোর্ট চালুর উদ্যোগ আসলে ভারতের সংবিধান এবং সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ। অনেক কষ্ট করে আম্বেডকর এবং সংবিধান সভার সদস্যরা দেশের জন্য যে আইন চালু করেছিলেন, এ আসলে তাকে অস্বীকারের চেষ্টা। খাপ পঞ্চায়েতের মতোই ভারতবর্ষের মধ্যে এক সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর চেষ্টা। এবং কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী পি পি চৌধুরি একদম ঠিক বলেছেন, এটা আসলে একটা রাজনীতির চেষ্টা।