রাহুলের ইফতারে রাজনৈতিক সমীকরণ, মোদীর মন্ত্র মুসলিমদের জন্য উন্নয়ন

মুসলিম মেয়েদের জন্য সংস্কারের রাস্তা থেকে সরতে চান না নাকভি-আকবররা

‘শিকঞ্জি’ থাকবে টেবিলের উপরে, সেই পানীয় দিয়েই হবে রোজা ভঙ্গ। আর ইফতারে থাকবে ম্যাকডোনাল্ড, থুড়ি ‘ধাবা’র থেকে নিয়ে আসা চিকেন ফ্রাই। রাহুল গান্ধীর ইফতার ঘিরে আমার এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। ‘শিকঞ্জি’ই যে আসলে কোকাকোলার পূর্বপুরুষ, এমনতর ঘোষণা করে আমাদের চমৎকৃত করে দেওয়া রাহুল গান্ধী ইফতারের মেনুতেও সেইগুলোই রাখবেন, এইটুকু ভাববো না?

কিন্তু সদ্য নাগপুরের আরএসএসের সদর দফতর ঘুরে আসা প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সুপরামর্শেই হোক, কিংবা যে কারণে রাহুল গান্ধীর দেওয়া ইফতারে টেবিলের উপরে এর কোনও কিছুই ছিল না। বরং ছিল পাঁচতারা হোটেলের আভিজাত্য আর জোট রাজনীতির নানা ধরনের সমীরকণ। যে সমীকরণে সীতারাম ইয়েচুরিও ছিলেন, ছিলেন তৃণমূলের প্রতিনিধি দিনেশ ত্রিবেদীও।

নিজের সিদ্ধান্তের বিপরীত মুখে গিয়ে রাহুল গান্ধী শেষ পর্যন্ত ইফতার পার্টি দিচ্ছেন জেনে শাসক বিজেপিও চুপ করে ছিল না। বুধবার একইদিনে দিল্লিতে বিজেপিরও ছিল পাল্টা ইফতারের আয়োজন। সেই ইফতার অবশ্য সংখ্যালঘু উন্নয়ণ বিষয়ক মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নাকভির বাড়িতে। এবং সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের চাইতে মুসলিম মহিলাদেরই ভিড় ছিল বেশি। এই মুসলিম মহিলাদের মধ্যে যেমন সেই সব মেয়েরা ছিলেন, যাঁরা নিজেরা তিন তালাকের শিকার, তেমনই এমন অনেকেও ছিলেন, যাঁরা মুসলিম মহিলাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছেন।

দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল যখন ঠিক ইদের আগে ইফতার পার্টির আয়োজন করে, এবং মুসলিমদের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলে, তখন অন্তত এই বিষয়টুকু নিশ্চিন্তে বলা যায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হিসাবে মুসলিমরা আর উপেক্ষিত নয়। বরং শুধুমাত্র ‘ভোটব্যাঙ্ক’ হিসাবে আর মুসলিমদের ভাবা হচ্ছে না, তার পরিবর্তে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। মোদী সরকারের অন্যতম মুসলিম মুখ, বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর নিজে মনে করেন, নরেন্দ্র মোদীর স্বাস্থ্য পরিষেবায় জোর দেওয়া বা ‘মোদী কেয়ার’ মুসলিমদের সামাজিক সুরক্ষার ঘেরাটপের মধ্যে বিশাল সংখ্যায় নিয়ে আসবে।

এমনিতে এবারের ইদের আগে গোটা বিশ্বে মুসলিমরা খুব আশাপ্রদ জায়গায় নেই। আইএস-এর প্রবল পরাক্রম হয়তো আর শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খুচখাচ মৌলবাদী হামলা লেগেই আছে। তার উপরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঘিরে রীতিমত অশান্ত প্যালেস্তাইন, সেখানেও রোজই মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে। সিরিয়াও এখনও অশান্ত, ঘরের পাশে আফগানস্তানেও রোজই বারুদের গন্ধ আর মৃত্যুর মিছিল। উত্তর কোরিয়ার কিম জন উনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প হাত মিলিয়ে নিলেও ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বাতিল করে দেওয়ায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্কে শুধুই উত্তেজনার পারদ চড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে ইদের ঠিক আগে গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে সোনালি রেখা বলতে কি? বিশ্বকাপে মিশরীয় তারকা মহম্মদ সালাহ-এর উপস্থিতি যদি নতুন ‘আইকন’ এর জন্ম দিয়ে থাকে, তবে আরও আশাব্যঞ্জক সৌদি আরবে সংস্কারের খোলা হাওয়া। নতুন সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালেমন অন্তত এইটুকু পরিষ্কার করে দিয়েছেন, তিনি তাঁর রাষ্ট্রকে সংস্কারের হাইওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনবেন না। সেই কারণেই সৌদি আরবে যেমন মহিলাদের গাড়ি চালানোর অধিকার এতদিনে দেওয়া হলো, তেমনই গত চার দশকের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে এখন থেকে সৌদি আরবে আর চলচ্চিত্র প্রদর্শনেও কোনও বাধা থাকলো না।

খোদ সৌদি আরবে যখন সংস্কারের খোলা হাওয়া, তখন ভারতবর্ষ কোন্‌ পথে হাঁটবে? কোন্‌ পথেই বা ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলি হাঁটবে? এখনও কি কংগ্রেস বুঝতে পারবে ‘তিন তালাক’এর সপক্ষে সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে আসলে দলের নেতা কপিল সিব্বাল মুসলিম মহিলাদের মধ্যে দলকে কোনঠাসাই করে দিয়েছেন। মুসলিম কট্টরপন্থীদের বিভিন্ন দাবির কাছে গান্ধী পরিবারের বারবার আত্মসমর্পন ইঙ্গিত দেয় কংগ্রেস আসলে মুসলিমদের যতটা ‘ভোটব্যঙ্ক’ হিসাবে দেখে, ততটা উন্নয়নের দৃষ্টিকোন থেকে দেখে না।

কংগ্রেসের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে মোদী সরকারের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রী মুক্তার আব্বাস নাকভি ঘোষণা করে দিয়েছেন, ২০১৯ এর নির্বাচন তাঁরা ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’ স্লোগান নিয়েই লড়তে চান, কোনও হিন্দুত্বের ‘অ্যাজেন্ডা’কে সামনে এনে ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে যাবে না বিজেপি। নরেন্দ্র মোদী যে গোটা বিশ্বের কাছে সেই ভাবমূর্তিই তুলে ধরতে চান, তার যথেষ্ঠ ইঙ্গিত অবশ্য এই রমজানের মাসেই ইন্দোনেশিয়া সফর করে প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ইন্দোনেশিয়াতেই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মুসলিমদের বাস। তাই শুধু চিনের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জন্য নয়, এপাশে ইরান এবং ওপাশে ইন্দোনেশিয়ায় ভারতীয় অর্থে বন্দর তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়ে আসলে নয়াদিল্লি বুঝিয়ে দিয়েছে তারা কি চায়।