রবীন্দ্রনাথ ও দেশপ্রেম

আমাদের বিশ্বাসে নিঃশ্বাসে অভ্যাসে এক প্রবল প্রগাঢ় প্রভাব বিস্তার করে আছেন রবীন্দ্রনাথ । তাঁর সাহিত্য সাধনা, জীবন সাধনার মহা সমুদ্রে দেশপ্রেম এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিশেষ করে তাঁর সংগীত কাব্যে যে দেশপ্রেম খুঁজে পাই, আমার আলোচনার পক্ষপাত সেই দিকেই থাকবে। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপ্রেম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, তিনি যে পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছিলেন তার আবহ ছিল স্বদেশ নিবেদিত। তাঁর শৈশবেই বঙ্গবোধ ও ভারতবোধ গড়ে উঠেছিলো। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীন চন্দ্র সেন প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সাহিত্য সৃষ্টি তাঁর মনে স্বদেশপ্রেমের গভীর প্রভাব ফেলে। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা, ঔপনিষদীয় ধ্যান-ধারণা, সত্যেন্দ্রনাথের বুদ্ধের জীবন ও বৌদ্ধ সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সংস্কৃতি কাব্যসাহিত্য চর্চা, রাজ রামমোহনের প্রগাঢ় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের মননে ভারতবোধ ও দেশত্ববোধে কাজ করেছিলো। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন –  “… আমাদের পরিবারের হৃদয়ের মধ্যে একটা স্বাদেশীভিমান স্থির দীপ্তিতে জাগিতেছিল। স্বদেশের প্রতি পিতৃদেবের যে একটি আন্তরিক শ্রদ্ধা তাঁহার জীবনের সকল প্রকার বিপ্লবের মধ্যেও অক্ষুন্ন ছিল। তাহাই আমাদের পরিবারস্থ সকলের মধ্যে একটা প্রবল স্বদেশপ্রেম সঞ্চার করিয়া রাখিয়াছিল। ” কিশোর বয়স থেকেই স্বদেশপ্রীতি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এক আলাদা অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছিল।

প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্য ও পরম্পরা, ভারতের আধ্যাত্মিক ঐক্যের আদর্শ তাঁর দেশপ্রেমকে ত্বরান্বিত করে। এখানে জড়লোক থেকে মনুষ্যচিত্ত পর্যন্ত এক সর্বতোবাহী চেতনা তথা প্রজ্ঞানের লীলা প্রবাহিত। তিনি বারে বারে ভারতাত্মার সন্ধান করেছেন। তাঁর চৈতালি, কথা, কল্পনা, নৈবেদ্য, গীতাঞ্জলি প্রভৃতি কাব্যে প্রাচীন ভারতের ভাবরূপ তার সৌন্দর্য মাধুর্য ও ঐশ্বর্য প্রকাশ করেছেন। উপনিষদ, প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্য, কালিদাসের কাব্য নাটক, মধ্যযুগের শিখ মারাঠা ঐতিহাসিক কাহিনি প্রভৃতি কবিকে স্বদেশপ্রেমে বিশেষ ভাবে উদ্বুদ্ধ করে। হোরিখেলা, মালী, গরুগোবিন্দ, শেষরক্ষা ইত্যাদিতে কল্পনায় কবি প্রাচীন ভারতের তপোবনের নিখুঁত চিত্র অঙ্কন করেছেন।  এই ভূখণ্ডের দর্শন, ধর্ম, আধ্যাত্মবাণী, মহাকাব্য সাগর পেরিয়ে সুমাত্রা যবদ্বীপ শ্যাম কম্বোজ চীন জাপান মঙ্গোলিয়া ছড়িয়ে পড়ল। কোনো সামরিক অভিযানে নয়,যা অন্য ধর্মের বিস্তার পন্থায় রয়েছে। দূর দেশ থেকে অভ্যাগতরা এদেশে এলেন এদেশে তীর্থসাধন করতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান আহরণের জন্য। ১৯২৭ সালে ‘বৃহত্তর ভারত’ প্রবন্ধে লেখেন – “আজ  একটি আকাঙ্ক্ষা আমাদের মধ্যে জেগেছে ভারতের বাইরেও ভারতকে বড় সন্ধান করতে চাই“। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বাণিজ্য চলতো, ভারতের পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, জ্যোতর্বিদ্যা আরবদের হাত ধরে গেল ইউরোপে। ‘ডিস্কভারি অফ ইন্ডিয়া’ তে জওহরলাল নেহেরু লিখেছেন – “ভারতবর্ষকে যদি জানতে বুঝতে হয়, আমাদের সময় স্থানের ব্যবধান ছাড়িয়ে দূরে যেতে হবে।তাহলে আভাস পাবো আমাদের দেশ একদিন কেমন ছিল, কী যোগ্যতা দেখিয়েছিল।” রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে ভারতকে জানতে হলে সেই যুগে যেতে হবে – “যখন সে তার আত্মাকে উপলব্ধি করেছিল, তার বাস্তব সীমা অতিক্রম করেছিল। যখন ভারত আত্মপ্রকাশ করেছিল দীপ্যমান মহানুভবতায়।“যে প্রকাশ পূর্ব দিগন্তকে আলোকিত করেছিল। বহু বিদেশের অধিবাসী এদেশকে আপন করে নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ভারত চেতনা ছিল বিশাল এবং ব্যাপক। তিনি একটি সুবিশাল অখণ্ড ভারতের প্রতিষ্ঠা দেন। 

ব্যাশামের কাছে যা “The wonder that was India” আসলে চিরকালই তা The enigma that is India. আশ্চর্য মিল দেশের সর্বত্র। মন্ত্র বা উপাসনায় একদিকে পূণ্যের সাধনা, অন্যদিকে শূন্যবাদ। সাকার নিরাকার, মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীতে উত্তরণ, বৈদিক, পৌরাণিক, লোকায়ত, বিবিধের মাঝে মহান মিলনকে তিনি পুজো করেছেন। তিনি  ভারতীয় সভ্যতা আর হিন্দু সভ্যতা সমার্থক করে দেখেছেন। তিনি বলেছেন –  “আমাদের হিন্দু সভ্যতার মূলে সমাজ। কিন্তু আমরা যদি মনে করি য়ূরোপীয় ছাদে নেশন গড়িয়া তোলাই সভ্যতার একমাত্র প্রকৃতি এবং মনুষ্যত্বের একমাত্র লক্ষ্য, তবে আমরা ভুল বুঝিব“। ভারতবর্ষের সমাজকে, তার কাঠামোকে তিনি সুন্দর ভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাই তিনি বলেছেন – “বিদেশী আক্রমণকারী ধূলার ঝড় তুলে ভারতে প্রবেশ করেছে কিন্তু ধূলাঝড় কেটে গেলে প্রমাণ হয়েছে, তারা সিংহাসন অধিকার করেছে, সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, কিন্তু ভারতাত্মাকে হত্যা করতে পারেনি।” এই দেশপ্রেম তাঁকে বারে বারে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বার বার এদেশের মানুষের মধ্যে দেশের সরূপ তুলে ধরতে চেয়েছেন। এদেশের অতীত গৌরবগাথা স্মরণ করিয়ে নতুন জীবনের দীক্ষা নিতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ স্বদেশকে ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে বিশ্বচেতনায় তাকে দেখেছেন। তিনি সর্বদিক থেকে দেশকে পরিপূর্ণ দেখতে চেয়েছিলেন। তাই তো তাঁর শান্তিনিকেতন,  শ্রীনিকেতন ও জমিদারিতে পল্লী উন্নয়নে অসংখ্য কাজ করেছেন। আধুনিক কৃষিবিদ্যা, গোপালন, মৎস্য চাষ, হস্তশিল্প – কুটির শিল্প, গ্রাম পঞ্চায়েত, গ্রামীন স্বায়ত্ব শাসন, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, পল্লীর স্বাস্থ্য চিকিৎসা, খাদ্যাভাব মোচন, পরিবেশ ও স্থাপত্য বিদ্যা, শিশু ও নারীশিক্ষা, বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষা প্রভৃতির মাধ্যমে এক বিরাট কর্মযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, পরাধীন ভারতে এমন উদাহরণ পাওয়া যায় না।এর মধ্য দিয়ে দেশবাসীর আত্মশক্তির জাগরণ ঘটাতে পেরেছিলেন । স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তাঁর ছিলো অসীম শ্রদ্ধা। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইংরেজদের দেওয়া নাইট উপাধি তিনি ত্যাগ করেন। কালান্তর, সভ্যতার সংকট প্রবন্ধে ইংরেজের স্বরূপ তুলে ধরে তার বিরোধিতা করেছেন। বঙ্গ ভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের কালে তাঁর স্বদেশ প্রেমের স্ফূরণ দেখা দেয়। আসমুদ্রহিমাচল ব্রিটিশ বীরোধিতা ছড়িয়ে দিয়েছেন। এই সময় স্বদেশপ্রেমের গানগুলি দেশবাসীকে আবিষ্ট করেছিল। যেমন- ১)এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে ২)যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে ৩)আজ বাংলাদেশের হৃদয় হতে ৪)বিধির বিধান কাটবি রে তুই ৫)আমি ভয় করব না ভয় করব না I তাঁর গোরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায় ইত্যাদি উপন্যাসগুলিতে, কর্তার ভূত, অচলায়তন, রক্তকরবী প্রভৃতি রূপক নাটগুলিতে দেশের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন এবং দেশপ্রেমের পরিচয় ফুটে ওঠে। আমাদের দুর্ভাগ্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর ক্যানভাসে স্বদেশবোধ ও স্বরাজ চেতনার ছবি একসময় এঁকেছিলেন তা স্বাধীনতা উত্তর ভারতে স্বার্থান্ধতায় আচ্ছন্ন, সংকীর্ণতায় মলীন। কবি এই ভারতবর্ষ চাননি, তিনি শঙ্করাচার্য, শ্রীচৈতন্য, বিবেকানন্দ, নেতাজীর  অখণ্ড মহান ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি খণ্ডিত ‘ইন্ডিয়া’ নয়, মহামানবের ভারতের ছবি এঁকে গেছেন সবসময়।