মোদিজির ব্রিগেড

একটু আগে মা চা দিয়ে গেল | কাগজে দেখলাম আজ দুপুর ২টায় ব্রিগেডে আসছেন প্রধানমন্ত্রী ; বাড়ির পাশের রাস্তায় তাই দেখ্ছি একটার পর একটা ব্রিগেডমুখি বাস , কল্যানি এক্সপ্রেসওয়ের প্রতিটা  বাসের পদ্মফুলের পতাকা আর ব্যানার লেখা আছে “আমি আসছি” | ঘড়ির কাঁটায় তখন ১০ টা , বিকেলের মাধ্যমিকের ব্যাচ টাকে কাল আসতে বলি ! পেপারে দেখলাম কম্পুটার শিক্ষকদের উপরে পুলিশের লাঠি চালানোর ঘটনা , তাঁরা প্রাপ্য় বেতনের দাবিতে শান্তিপূর্ন অবস্থান করেছিলেন | হঠাৎ অরিত্রর মেসেজ ..কি রে  যাবি ? ব্রিগেড .. রিপ্লাই দিলাম …    মা চায় না রাজনীতির সাথে জড়াই | তৃনমুলের মস্তানি , গনতন্ত্রের বিপর্যয় দেখেই হয়ত বলেছেন | কিন্তু আজ যিনি আসছেন তিনি শুধু রাজনীতিবিদ নন, জাতির মহানায়ক যিনি ভারত কে বিশ্বগুরু বানানোর স্বপ্ন দেখান , যিনি সর্বত্যাগি , সংষ্কারক , দূরদৃষ্টি ও অসাধারন বাগ্মীতা সম্পন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রি নরেন্দ্র মোদিজি |   সম্প্রতি বামেদের আর তৃনমুলের দু দুটো ব্রিগেড সমাবেশ হয়েছে |পাশের বস্তি থেকে কাউকে টাকার বা মদের  লোভ দেখিয়ে , কাউকে ভয় দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাও শুনেছি ,দেখেছি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতাদের কথা শুনতেও মানুষ আসে !   মেট্রো করে সোজা নামলাম ময়দানে | ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ২ টা ভাবছি এই বুঝি দেরি হয়ে গেল | রাস্তায় মানুষের ঢল দুর্গাপূজাকেও হার মানাবে | সবাই আজ ব্রিগেড মুখি | মধ্যবঙ্গ ও দক্ষিনবঙ্গের গ্রাম-শহর-শহরতলির আট থেকে আশি গনতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে ব্রিগেডে উপস্থিত | এই কারনে ০৩.০৪.২০১৯ এর ব্রিগেড ঐতহাসিক | আসবে না কেন?রাজ্যের প্রায় ১৩ লাখ গরীব  বিনামুল্যে তার জমির উপরে স্বপ্নের পাকাবাড়ি  পেয়েছেন ( প্রধানমন্ত্রি আবাস যোজনায় ), স্বচ্ছ ভারত মিশনে সকল গরীব মানুষ  পাকা বাথ্রুম ব্যবহার করছেন , গরীব মা বোনেরা কাঠের জ্বালানি ছেড়ে দিয়েছেন কারন  দেশজুড়ে  প্রায় ৭ কোটি গ্য়াস সংযোগ দেওয়া হয়েছে বিনামুল্য়ে , গরীব এত বছর পর আজ ব্যাংকের চৌকাঠ পেরোল  জন ধন যোজনার জন্যে |    আবার এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রি ৫ লাখ টাকার আয়ুস্মান সাস্থ্যবিমা চালু হতে দিলেন না নিজের রাজনৈতিক সংকীর্নতার জন্য |তাছাড়াও পঞ্চায়েতে গনতন্ত্রের হত্যা , অনুপ্রবেশ, চাকুরিপ্রার্থিদের অনশন  , তোষন , ধর্মিয় আস্থায় আঘাত , সিন্ডিকেট রাজ ,সারদা-নারদা-রোস্ভ্যালিতে একের পর এক নেতা নেত্রির নাম জড়িয়ে যাওয়া এই বিশাল জনমানসকে ব্রিগেডমুখি করেছে |  আমার বন্ধুদের সাথেও দেখা হয়ে গেল ,চারিদিকে শুধু পদ্মফুলের নিশান হাতে নিয়ে সাধারন বাঙালি সমাজ -না এলে হয়ত এ ছবি দেখতে পেতাম না | মানুষের উৎসাহ  চোখে পড়ার মতো,কলকাতা পুলিশের ব্যবস্থাপনা বেশ ভাল |  একটা বসার জায়গা খুজছি | চারিদিকে অগনিত মানুষের ভিড় ঠেলে কোনমতে একটা জায়গা পাওয়া গেল | মুল সভামঞ্চের সোজাসুজি | চারিদিকে অসংখ্য জায়ান্ট স্ক্রিন ও সাউন্ড বক্স | একজন স্বেচ্ছাসেবক এর কাছে কয়েকটা জলের পাউচ পাওয়া গেল | আমরা যে শেড টার তলায় বসেছিলাম ওরকম আরো ৯ টা শেড ছিল | প্রচন্ড গরমে মানুষকে স্বস্তি দিতে এরকম মানবিক পদক্ষেপকে বাহবা জানাই ,প্রতিটা ব্লকে তিল ধারনের জায়গা নেই | অনেকের উৎসাহ এতটাই যে প্রচন্ড রোদকে উপেক্ষা করে  দাড়িয়ে আছেন |ভিড় বাড়তে লাগল | শিশু কোলে মা , বয়স্ক নাগরিক , মধ্যবয়স্ক স্ত্রী পুরুষ আর সবথেকে বেশি মাত্রায় তরুন প্রজ্ন্ম – সবাই চায় প্রিয় প্রধানমন্ত্রিকে এল ঝলক দেখতে |  কথা হল ঘাটাল থেকে আগত সুমন বাবুর সাথে | বন্যায় মানুষের দুর্ভোগের কথা বললেন | রাজ্য প্রসাশন তথা সাংসদ দেবের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিলেন | কথা হল পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতোর সাথে | জেলায় কৃষকদের বেহাল অবস্থা তথা শাসক দলের অত্যাচারের কথা বললেন | এসেছিলেন ব্যারাক্পুরের সৌমেন দা , বাঁকুড়ার ইন্দাসের সঞ্জয় ; দুজনেই মোদিজিকে  খুব সম্মান করেন | পেশায় রাজমিস্ত্রি  ইফতিকার তার স্ত্রী শাবানা  এসেছেন কাটোয়া থেকে মোদিজির ভাষন শুনতে |  মোদিজির হেলিকপ্টার দেখা গেল বিকেল ৪ টে নাগাদ | সুদুর শিলিগুড়িতে জনসভা ছিল আজ | প্রধানমন্ত্রি কিছুক্ষনেরমধ্যে উপস্থিত মুল মঞ্চে| যারা বসেছিলেন সবাই দাঁড়িয়ে  হাত দেখাতে লাগলেন | মোদি মোদি মোদি ধ্বনিতে ব্রিগেড তখন মুখরিত |মাইক্রোফোনের সামনে আসতেই এই ধ্বনি আরোও জোরালো হয়ে উঠল |  ৪৫০০ দিন মুখ্যমন্ত্রি ও ১৮০০ দিন প্রধানমন্ত্রি থাকা গুজরাটের  এই মানুষটি সাবলিল ভঙ্গিতে বাংলায় বলে উঠলেন “আপনারা কেমন আছেন ” ; সমস্বরে উত্তর এল “ভালো” . যে দেশের প্রধানমন্ত্রি রাত দিন এক করে দেশের কথা ভাবেন সেই দেশের মানুষ খারাপ থাকতে পারে না | মা কালিকে স্মরণ করে বলা শুরু করলেন , ” ভারতে কিছু লোক আছে যারা মোদির বিরোধ করতে করতে ভারত মা এর বিরোধিতা করতে শুরু করেছে , পাকিস্তানের উপর হামলার প্রমান চাইছে ? নিজের দেশের সেনার কাছে প্রমান চাওয়ার পাপ  করেছে ? আতঙ্কবাদিদের লাশ  দেখতে চাইছিল ? এরকম প্রশ্ন ও অভিযোগ আসলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রির দিকে ছুড়ে দিলেন |  অন্যদিকে কংগ্রেসের ঘোষনাপত্রে আফ্স্পা আইন  ও দেশদ্রোহি আইন তুলে দেওয়ার প্রস্তাবকে তুলোধনা করলেন | ক্ষমতালাভের প্রচন্ড ক্ষিদে কংগ্রেসের মত একটা দলকে আত্ঙ্কবাদি , মাওবাদি , বিচ্ছিন্নতাবাদিদের সমর্থক বানিয়ে ফেলেছে – যা সত্যি চিন্তাজনক |  এন আর সি নিয়েও তৃনমুল এর কাছে জবাব চাইলেন | কিছুদিন আগে যারা  ব্রিগেডে ” মোদি হাটাও ” নারা দিয়েছিল তাদের উদ্দেশ্যে বললেন “আমি কি দোষ করেছি ?  গরীবদের ঘর দেওয়া কি দোষের ? গরীব মা বোনেদের রান্নার গ্যাস , গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ দেওয়া যদি দোষের হয় তাহলে সেই দোষ আমি করেছি “|” ৫ বছর আগে কি কেউ ভেবেছিল যে ৫ লক্ষ টাকা পর্য্ন্ত আয়ে আয়কর দিতে হবে না , গরীবদের জন্য ৫ লক্ষ টাকার বিমার কথা , অসংরক্ষিত বর্গের মানুষ ১০% সংরক্ষন পাবেন ?  অসম্ভব আজ সম্ভব” |   তৃনমুল গুন্ডারাজ, সপ্তম পে কমিশন নিয়েও খোঁচা দিলেন তৃনমুল সরকারকে | প্রধানমন্ত্রি এও বললেন “২০১৪ তে অপনাদের ভোটের কারনে কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্প গুলির রূপায়ণ সম্ভব হয়েছে “|” ২০১৪ তে আপনাদের ভোটের কারণে আমরা ৭২ বছরের গর্ত গুলো ভরতে পেরেছি , ২০১৯ আপনারা আর আমরা মিলে বিকাশের নতুন উচ্চতা স্পর্শ করব | ২০১৪ র আপনাদের ভোটের জন্য আতঙকবাদিদের সমুচিত জবাব দেওয়া গেছে , ২০১৯ এ আপনাদের ভোটেই  ওদের শেষ করা হবে |২০১৪ তে ভারত ফ্য়ামিলি ফার্স্ট থেকে ইন্ডিয়া ফার্স্ট হয়েছে আর ২০১৯ ভারত এর অর্থনিতি ফার্স্ট হবে | ২০১৪ র আপনাদের ভোটের কারনে দুর্নীতি গ্রস্ত নেতারা জেলের দরজা পর্যন্ত গেছে , ২০১৯ আপনাদের ভোটের কারনেই ওরা ভিতরে ঢুকবে |   মোদিজি স্বামী বিবেকানন্দের প্রসঙ্গ টেনে বললেন ” দেশ স্বাধীন হবার পরবর্তি ৫৫ বছর স্বামীজির আদর্শে ভারত এগোলে দেশ আজ অনেক উন্নত হত কিন্তু দুর্ভাগ্য যে লোকতন্ত্রের বুর্খা পরে পরিবারতন্ত্র রাজ করেছে | ৭২ বছরে কম করে ১৫ বছর লোকতন্ত্র ছিল | আমাদের প্রতিভা , লড়াকু মানসিকতা, প্রাকৃতিক  সম্পদ কোন কিছুর অভাব ছিল না কিন্তু পরিবারতন্ত্র  তরুন প্রতিভাকে , গরীবের স্বপ্নকে শেষ করে দিয়েছে | সেনাবাহিনির শৌর্যে দালালির গ্রহন লাগিয়েছে, সৌহার্দের মধ্যে জাতিবাদের বিষ নিক্ষেপ করেছে , পশ্চিমবঙ্গও  আজ পরিবারতন্ত্রের বোঝার তলায় চাপা পড়ে গেছে | ”  তিনি বললেন ” বাংলার মাটি দেশভক্তদের মাটি , সময় আসছে বাংলার মানুষ ইংরেজ শাসনের ন্যায় এই পরিবারতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে লোকতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন , যে বোমা ও বন্দুকের সংষ্কৃতি রাজ্যে তৈরি হয়েছে তা স্বাধিনতা সংগ্রামিরা তথা বিখ্যাত বাঙালিরা স্বপ্নেও ভাবেননি “|

By Tanmoy Panda