মুসলিম মহিলারা ‘মেহরাম’ ছাড়া হজে যেতে পারবেন, সংস্কারের রাস্তা থেকে সরছে না মোদী সরকার

মুসলিম মহিলাদের জন্য দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারটি সেরে ফেলল কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার। এবার থেকে মুসলিম মহিলারাও ‘মেহরাম’ বা অভিভাবক ছাড়া হজে যেতে পারবেন। তবে তাঁদের বয়স ৪৫ এর ওপরে এবং একসঙ্গে ৪জন মহিলাকে যেতে হবে। হজ কমিটির সুপারিশ মেনে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৮ থেকেই এই নিয়ম চালু করে দিল। কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ কমিটি যখন প্রথম এই সুপারিশ করেছিল, তখন মুসলিম পুরুষতন্ত্র এবং দেওবন্দ-এর মতো কট্টরপন্থীরা এর কড়া বিরোধিতা করেছিল।

সোমবার সকালে আমি যখন ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারের জন্য যাচ্ছি, তখনই একের পর এক মুসলিম মহল্লায় দেখছিলাম, ২০১৮ তে হজে যাওয়ার জন্য আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন চাওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য হজ কমিটির লাগানো সেই বিজ্ঞপ্তিতেও পরিষ্কার লেখা আছে, ‘মেহরাম’ ছাড়া কোন মহিলা যেতে চাইলে, তাঁকে কিভাবে আবেদন করতে হবে। মধ্য কলকাতার রাজাবাজার মোড় হোক, কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগণার প্রত্যন্ত কোন এলাকা, সব জায়গাতেই দেওয়ালে মোড়ে শোভা পাচ্ছে হজ কমিটির এই নতুন বিজ্ঞপ্তি।

নভেম্বরেই আমি কাজের প্রয়োজনে ইংল্যান্ডে এবং আমেরিকায় ছিলাম। ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার মুসলিম মহিলারা হজ করতে চাইলে এই সুযোগ অনেকদিন আগে থেকেই পেতেন। শর্ত ছিল একটাই, সেই মুলিম মহিলাদের বয়স ৪৫ এর উপর হতে হবে। এবং ৪জন মুসলিম মহিলাকে একসঙ্গে যেতে হবে। এই যে কোন পুরুষ অভিভাবক বা ‘মেহরাম’ ছাড়া মুসলিম মহিলাদের হজে যাওয়ার অধিকার দেওয়া, এটা যে ‘মোল্লাতন্ত্র’ এবং পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কতবড় দাবি আদায়, তা আমি বলে বোঝাতে পারবো না।

মুসলিম মহিলাদের এইভাবে ৪জনকে একত্রে এবং ৪৫ বছরের উপরে বয়স হলে হজ যাত্রার অধিকার দেওয়া কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। মাথায় রাখবেন ‘তিন তালাক’ নিয়ে আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমরা যে কট্টরপন্থীদের ক্রমাগত বিরোধিতা করতে দেখেছিলাম, এক্ষেত্রেও সেই একই পুরুষতন্ত্র ‘ধর্ম রসাতলে’ যাচ্ছে বলে হৈ চৈ জুড়েছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর সরকার সমস্ত আপত্তিকে উড়িয়ে দিয়ে এবার মুসলিম মহিলাদের জন্য হজ যাত্রার অধিকারও এনে দিল।

মুসলিম মহিলারা কোন ‘মেহরাম’ ছাড়া হজে যেতে পারেন কিনা এই নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো। একদিকে যেমন কট্টরপন্থীরা এই নিয়ে যে কোনো প্রস্তাবকে কখনই মানতে চাননি, তেমনই অনেক ধর্ম বিশেষজ্ঞ মনে করেন যদি সেই মহিলার বয়স ৪৫ পেরিয়ে গিয়ে থাকে, এবং যদি ৪জন মহিলা একসঙ্গে হজে যেতে চান, তাহলে তাঁদের সেই অধিকার দেওয়া উচিত। যে সৌদি আরবকে অনেকেই মুসলিম বিশ্বের ‘অভিভাবক’ বলে মনে করেন, সেই সৌদি আরবও এই বিষয়টিকে অনুমোদন করে। সেই কারণেই অনেকদিন ধরেই ইংল্যন্ড কিংবা আমেরিকর মুসলিম মহিলারা এই অধিকার ভোগ করতেন।

কিন্তু ভারতবর্ষে তো এতদিন মুসলিম মহিলাদের অধিকারের চাইতে মুসলিমদের ‘স্বঘোষিত’ অভিভাবক ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড’ এর যুক্তিই বেশি গুরুত্ব পেত। ঠিক যে কারণে শাহবানু মামলা্য় সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পরেও রাজীব গান্ধীর সরকার সেই রায়কে বাতিল করে অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল, সেই একই কারণে এতদিন কোনও সরকার মুসলিম মহিলাদের হজ যাত্রার এই দাবিকে, এই অধিকারকে স্বীকৃতি দেয় নি। এই বিষয়ে যে সৌদিআরব বা সেখানকার ‘হজ ব্যবস্থাপক’দের কোনও আপত্তি নেই, তা জেনেও মুসলিম মহিলাদের হজের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। গোটা বিশ্বের মুসলিম মহিলারা যে অধিকার পান, তার থেকে ভারতীয় মুসলিম মহিলারা এতদিন বঞ্চিত ছিলেন।

কিন্তু সৌদি আরবেও এখন ‘পরিবর্তণ’এর হাওয়া। নতুন সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমান একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে গোটা দুনিয়াকে হতবাক করে দিচ্ছেন। ঠিক সেই সময়ই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ভারতীয় মুসলিম মহিলাদের জন্য দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের দরজা খুলে দিল।