বিজেপি ভোটে জিতছে, আর মুসলিম মহিলাদের সংস্কারের পথ আরও খুলছে

উত্তরপ্রদেশের কোনো ভোটে বিজেপি সাফল্য পেলেই, বোধহয় মুসলিম মেয়েদের জন্য সুখবর আসে। সেইজন্যই যে দিন উত্তরপ্রদেশের পুরনির্বাচনে বিজেপির জয়জয়াকারের খবর এলো, সেই দিনই সরকারের তিন তালাক বন্ধের জন্য করা আইনের খসড়াও সামনে এলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এর নেতৃত্বে মন্ত্রীপরিষদের তৈরি এই খসড়া আইন মুসলিম মেয়েদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

নতুন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, যদি কোনো মুসলিম পুরুষ আবার ‘ইনস্ট্যান্ট’ তিন তালাক দেন, তাহলে সেটা জামিন অযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। এবং পুরুষের তিন বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানা, দুইই হতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা এই আইন এবার রাজ্য সরকারগুলির মতামত জানতে চাওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মনে রাখবেন, সংবিধান অনুযায়ী তিন তালাক নিয়ে আইন প্রণয়নের জন্য কেন্দ্রের রাজ্য সরকারের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

কেন বললাম উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ভোটে সাফল্য পেলেই মুসলিম মহিলাদের কপাল খোলে? মাথায় রাখবেন, এই বছরের গোড়ার দিকে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভার নির্বাচনে বিপুল ভোটে জেতার পর তিন তালাক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চলা মামলায় সরকারও তেড়েফুঁড়ে তিন তালাক নিষিদ্ধ করার জন্য সওয়াল করেছিল। তদানীন্তন অ্যটর্নি জেনারেল মুকুল রোহাতগির সেই অসাধারণ সওয়াল সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে শোনার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল।

তারপরই এই বছরের ২২ অগষ্ট সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাককে নিষিদ্ধ করে সেই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিল। হয়তো একটা পরিসংখ্যানই মাত্র, কিন্তু তবু জানিয়ে রাখা ভালো, তিন তালাককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পরে এখনও পর্যন্ত মাত্র ১০০ দিন কেটেছে। কিন্তু গত ১০০ দিনে প্রতিদিন গড়ে ২টিরও বেশি অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকারে কাছে জমা পড়েছে তিন তালাকের বিষয়ে। বলাই বাহুল্য অভিযোগকারীরা সবাই মুসলিম মহিলা এবং তাঁদের স্বামীরা তালাক দেওয়ার সময় তাঁদের সাথে সুবিচার না করায় ওই মহিলারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অভিযোগে জানিয়েছেন।

যেদিন তিন তালাকের রায় বের হয়েছিল, তার পরেরদিনই ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকায় আমার লেখায় আমি লিখেছিলাম, সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় ভারতের মুসলিম মহিলাদের জন্য সংস্কারের ‘ফ্লাডগেট’ খুলে দেবে। পরের ১০০ দিনে মুসলিম মহিলারা যে রকম সাহস করে নিজেদের প্রতি অবিচারের প্রতিবাদ জানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারস্থ হয়েছেন, তা আমার পূর্বাভাসকেই সত্যি বলে প্রমাণ করেছে। এবার কেন্দ্রীয় সরকার যদি এই খসড়া আইন  সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে পেশ করে দেয়, তাহলে ভারতবর্ষে প্রায় ১০ কোটি মুসলিম মহিলার জীবনে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।

উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে দেওবন্দের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জায়গাতেও বিজেপির জয় প্রমাণ করে দিয়েছিল, তিন তালাক নিয়ে নরেদ্র মোদীর অবস্থান মুসলিম মহিলাদের ‘পদ্ম’ এর দিকে ঝুঁকতে প্ররোচিত করেছে। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে জেতার পরই এমন কি নতুন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পিতাও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি আশা করেন তাঁর ছেলে মুসলিম মহিলাদের দুর্দশা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। যোগী আদিত্যনাথ অবশ্য একধাপ এগিয়ে তিন তালাকের জন্য মুসলিম মহিলাদের অবস্থাকে ভরা কৌরব রাজসভায় ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।  এবং যোগীর বক্তব্য ছিল, দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের সময় চুপ করে ধৃতরাষ্ট্র বা দ্রোণাচার্যরা যেভাবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন, ঠিক সেইভাবেই তিন তালাকের ক্ষেত্রে মুসলিম মহিলাদের সপক্ষে মুখ না খুলে বিরোধীরা একই অন্যায় করেছে। অবশ্যই যোগী আদিত্যনাথের নিশানা ছিল রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস এবং তাঁদের সহযোগী অন্য বিরোধী দলগুলি।

উত্তরপ্রদেশের সাম্প্রতিকতম নির্বাচনে আমেঠিতেও ভরাডুবির পর রাজীবতনয় নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, শাহবানু মামলার রায়কে উল্টে দিয়ে অর্ডিনান্স এনে তাঁর বাবা, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যে ঐতিহাসিক ভুল করেছিলেন, তিনি নতুন যুগের প্রতিনিধি হয়েও আসলে কংগ্রেসকে সেই ‘ভুল’এর খপ্পর থেকে বার করতে পারেন নি। বরং তাঁর বিশ্বস্ত লেফ্টেন্যান্ট কপিল সিব্বাল তিন তালাক মামলায় মুসলিম মহিলাদের বিরোধিতা করে পুরুষতন্ত্রকে সমর্থন করায় আসলে কংগ্রেসের মুখই পুড়েছে। গান্ধী পরিবারের এই একের পর এক অবিমৃষ্যকারিতায় আজ প্রগতিশীলতার ঝান্ডাটা নরেন্দ্র মোদী নিজের হাতে তুলে নিতে পেরেছেন।

সামনের গুজরাট বিধানসভার নির্বাচন। গুজরাট বিধানসভার নির্বাচনের ফল যখন বেরোবে তখনও হয়তো সংসদের শীতকালীন অধিবেশন চলবে। এবং সেই অধিবেশনে তিন তালাক বন্ধ করতে সরকারি আইনও পেশ হয়ে যাবে। গুজরাতের নির্বাচনের ফলাফলও যদি নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির অনুকূলে যায়, তাহলে সংস্কারের যে রথ মোদী চালাতে পারেন, তার মোকাবিলা রাহুল গান্ধী কিভাবে করবেন? শুধু বলিউডের সিনেমা থেক চোখা সংলাপ ধার করে?