পশ্চিমবঙ্গ নামটি ইতিহাসের উত্তরাধিকার

১৯৪৭ সালের ১৪ অগষ্ট এক দেশ ভারত ভেঙে দু’টুকরো হল। গড়ে উঠল পাকিস্তান। জিন্না সাহেবের টাইপ রাইটার থেকে জন্ম নিল ভারতীয় মুসলমানদের নিজস্ব দেশ। পরদিন স্বাধীন সার্বভৌম ভারত রাষ্ট্র জন্ম নিল। ধর্ম নিরপেক্ষ আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সাত দশকে ভারত সেই দিনের রাষ্ট্রীয় আদর্শ ত্যাগ করেনি। ভারতীয় রাষ্ট্রীয় আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়ে আত্মপ্রকাশ করল পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৪৭-এর ২০ জুন সাবেক বাংলার বিধানসভার দুটি সমান্তরাল অধিবেশন বসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান-প্রধান পূর্ববঙ্গ আর ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু-প্রধান পশ্চিমবঙ্গ। রাতারাতি এই ইতিহাস রচিত হয়নি। মাঝখানে বয়ে গেয়ে ভয়ংকর দাঙ্গা ও হত্যাকান্ডের বদরক্ত।

স্বাধীনতার আগেই একটি প্রস্তাব উঠে এসেছিল। স্বাধীন বঙ্গভূমি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন শরৎচন্দ্র বসু, যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল আর বাংলার মুসলিম লিগ। শরৎবাবু তখন ভারতের রাজনীতির মূল ধারা থেকে সামান্য দূরে সরে ছিলেন। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল মুসলিম লিগের সহযোগী- জিন্নার প্রস্তাবে অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী। পূর্ববঙ্গের তফসিলি জাতিগোষ্ঠীর উপর তাঁর প্রভাব ছিল। তাঁর যুক্তি ছিল বাংলা ভাগ হলে পূর্ববঙ্গের কৃষক সমাজের জীবনে আসবে ব্যাপক অভিঘাত। জিন্নার মত ছিল বাংলা স্বাধীন হলে তাঁরা স্থির করবেন ভারত বা পাকিস্তান কার সঙ্গে তাঁরা থাকবেন। যদি তারা তৃতীয় কোনও রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায় তাতেও মুসলিম লিগের কোনও আপত্তি নেই। সাত দশকের ব্যবধানে সহজেই বুঝতে পারি জিন্না সাহেবের কৌশলটি ছিল কী রকম। অখন্ড বাংলায় সংখ্যাগুরু মুসলমান শাসনই প্রতিষ্ঠা হবে। এ ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন নিশ্চিত।

শ্যামাপ্রকাশ মুখোপাধ্যায় তখন মন্ত্রী। মূলত তাঁর নেতৃত্বে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাজ্য গড়ার  আন্দোলন গড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বাংলার হিন্দুরা সেদিন ভারত রাষ্ট্রের ধর্ম-নিরপেক্ষতার আদর্শকে সামনে রেখে গড়ে তুললেন ‘পশ্চিমবঙ্গ’। জিন্না সাহেব হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন- কলকাতা ছাড়া পূর্ব পাকিস্তান আসলে moth-eaten Pakistan. সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে পরাস্ত করার এই গৌরব-উজ্জ্বল ইতিহাস ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাজ্যটির নামে যুক্ত আছে। এই ‘পশ্চিম’ বিশেষণটিকে আজ যারা অবান্তর অর্থহীন বলে মনে করছেন- টকশোতে বাজার গরম করছেন তাঁরা আসলে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ গড়ে ওঠার ইতিহাসটি ইচ্ছা করেই ভুলে যাচ্ছেন নাকি?

শ্মশানের চিতা নিভিয়ে ফেরার পর সেদিকে আর তাকাই না আমরা। দাঙ্গা বিধ্বস্ত পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা দলে দলে নতুন ইহুদি হয়ে আসতে শুরু করলেন। আমরা এই ইতিহাস শুরু করলাম শিয়ালদহ রেল স্টেশন থেকে! পূববঙ্গ হারিয়ে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে। সারা রাজ্যে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন দেওয়া শুরু হল। আজ যদি প্রশ্ন করি, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি না থাকলে উদ্বাস্তুরা থাকতেন কোথায়? বিহার-অসম-ওড়িশায়? পশ্চিমবঙ্গে তখন উদ্বাস্ত পুনর্বাসনের দাবিতে বাঙালি উদ্বাস্তুদের বাংলাতেই পুনর্বাসিত করার দাবিতে বামপন্থীরা রাজনীতি শুরু করেছেন। দন্ডকারণ্য-আন্দামানের পুনর্বাসন প্রস্তাব হল মন্দীভূত। যদি প্রশ্ন করি, পশ্চিমবঙ্গ না থাকলে এইসব আন্দোলন তাঁরা করতেন কোথায়?

কলকাতার প্রান্তীয় জলাভূমিতে গড়ে উঠল উদ্বাস্তু বাঙালিদের কলোনি। দমদম থেকে টালিগঞ্জ- জীবন তখন ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মতো ক্ষীণ- নিরালোক। প্রথম প্রজন্মের উদ্বস্তুদের স্মৃতিতে ‘দেশের বাড়ি’ জীবন্ত ছিল। ক্রমে নতুন প্রজন্ম উদ্বাস্তু পরিচয় আড়াল করতে থাকলেন। কলোনিগুলির নাম বদলে হতে থাকল- যেমন করেই হোক ভুলে যেতে হবে অন্ধকার পরিস্থিতির কথা, অত্যাচার, সর্বম্বান্ত হওয়ার বেদনার ইতিহাস। আজ যারা ‘পশ্চিম’ বিশ্লেষণটি খসিয়ে বাংলাকে নতুন নাম দিতে চাইছেন তাদের একটা বড় অংশ ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় এসেছিলেন। তাঁরাও কি উদ্বাস্তু সমাজের নতুন প্রজন্মের তরুণদের মতো স্বেচ্ছা বিস্মরণের পথে হাঁটতে চাইছেন!

ঠিক, পূর্ববঙ্গ বলে কোনও অঞ্চল এখন নেই। ১৯৪৭ থেকে সেখানে ইতিহাস দ্রুতগতিতে ভাঙা-গড়ার দিকে গেছে। উর্দু নয়, রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকেও মর্যাদা দেওয়া হোক, দাবি উঠেছে পাকিস্তান পার্লামেন্টে। প্রস্তাবটি তোলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কংগ্রেসি সংসদ সদস্য- ১৯৭১ সালে তাঁকে হত্যা করে ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনী। আমৃত্যু তিনি পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রীয় আদর্শ রক্ষার চেষ্টা করেছেন। ১৯৫২-র ২১-২২ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় আদর্শের বিরুদ্ধে প্রথম অভিঘাত। ক্রমে দ্বিজাতি তত্ত্বের ফানুসটি ফেঁসে গেল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানে অত্যস্ত ক্ষীণজীবী। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ বড়জোর এই ক’বছর। তখন সংবিধানে বাংলাদেশ ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ। ক্রমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থান নিয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আর ইসলামি মূল্যবোধকে তুলে ধরার দুর্মর পাকিস্তানী ভাবাদর্শকে আশ্রয় করে। জিয়া-এরশাদ-খালেদা-হাসিনা—কোনও সরকারই এই প্রবণতাকে অস্বীকার করেননি। করতে চাননি।

আজ যখন পশ্চিমবঙ্গ নামটি বদলাবার বিষয়ে সহসা অপ্রস্তুত বিতর্ক ঘনিয়ে উঠছে তখন এই কথাগুলি লিখবার প্রয়োজন পড়ল। পশ্চিমবঙ্গ কেবল একটি রাজ্যের নাম নয়- এ হল আমাদের রাষ্ট্রীয় আদর্শ- ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে একটি আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। পূর্ববঙ্গ নেই যখন তখন ‘ইষ্ট বেঙ্গল’ ক্লাবের নামটি বদলাবার কথা কি কেউ ভাববেন? নিশ্চয় না। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন, অনুশীলন সমিতি, অশ্বিনী দত্ত, ত্রৈলোক্য মহারাজ, নেলী সেনগুপ্ত, ইলা মিত্র, মণি সিংদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির উত্তরাধিকার বাংলাদেশ বহন করছে না। তাদের ইতিহাস বাঙালি মুসলমানদের আত্মতার ইতিহাস- দ্বিজাতি বা ত্রিজাতি তত্ত্বের খোলসে বন্দি। পুন্ড্রবর্ধন-দিনাজপুর-পাহাড়পুর-বজ্রযোগিনী-শ্রহট্টের ইতিহাস সেখানে আড়াল হয়ে আছে। লালন সাঁইকে মুসলমান বানানো আর ইশাখাঁ-শাহজালালদের বীর হিসাবে দেখাবার ইচ্ছা সেখানে প্রবল। ময়মনসিংহকে মোমিনশাহী, ভোলাকে শরিয়তপুর বানিয়ে তাঁরা পূর্ব-বাংলাকে ধ্বংস করে চলেছেন। পশ্চিমবঙ্গ- শুধুমাত্র এই একটি ভূখন্ডের নামই বাতিঘরের মতো ভবিষ্যতের দিগন্তে ভারত রাষ্ট্রের মূল কথাগুলিকে বাঙ্ময় করতে পারে। আর এ নিয়ে অপ্রস্তুত বিতর্কে নেমে বুদ্ধিজীবীরা যেসব প্রস্তাব রাখছেন তাতে না আছে বিবেচনা বোধ, না আছে যুক্তি।

ভারতের নানা প্রান্তে শহর রাজ্য নামে বদল হয়েছে। বোম্বাই হয়েছে মুম্বই, মাদ্রাজ হয়েছে চেন্নাই, তামিলনাডু, ঝাড়খন্ড, উত্তরাখন্ড, ছত্তিশগড় বা তেলেঙ্গানা। তাই নাম বদলে আপত্তি করছেন না কেউ কেউ।  পাঞ্জাব রাজ্যও বিভক্ত হয়েছে- পূর্ব পাঞ্জাব হয়নি। ভারতীয় পাঞ্জাব তিনটি রাজ্যে পরিণতি পেয়েছে। হিমাচলপ্রদেশ-হরিয়ানা আর পাঞ্জাব। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গকে ‘বঙ্গ’ বলতে চান কেউ কেউ। তারা মনে রাখছেন না পাঞ্জাবে জন-বিনিময় সম্পূর্ণ হয়েছিল। আর পশ্চিমবঙ্গের শতকরা দু’জন মুসলমানও পূর্ব বাংলায় যাননি। কেউ কেউ গিয়েও ফিরে এসেছেন। পক্ষান্তরে পূর্ব বাংলার অমুসলমান জনগোষ্ঠী ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু, নেহরু-লিয়াকত চুক্তি বা ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিকে বুড়োআঙুল দেখিয়ে বাংলায় যে ব্যাপক বাংলাদেশি মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঘটছে তাতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলির জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ।

‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি ধরে রেখে এর সঙ্গে মোকাবিলা করার দরকার যখন- তখনই আমাদের নেতা-মন্ত্রী রাজ্যের নাম বদলাবার উদ্যোগ নিলেন। তারা ইতিহাসের পাঠ ভুলে সম্ভবত রাজনীতির লাভ-ক্ষতিকেই প্রাধান্য দিতে চান। ব্যাপারটি ভয়ংকর- তীব্র আপত্তি উঠে আসা দরকার। আমরা আর একবার উদ্বাস্তু হতে চাই না। ভারত রাষ্ট্রের আদর্শ- সংবিধান, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার কবচ-কুন্ডল পশ্চিমবঙ্গ’ জন্ম থেকে বহন করছে। তাকে ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হোক।

 

লেখক গৌরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে বর্তমান পত্রিকায় ১১ অগষ্ট ২০১৬