পশ্চিমবঙ্গের সুপ্রাচীন ইতিহাস এবং তা উন্মোচনের সম্ভাবনা

“আমার সোনার বাংলা ” কথাটাই এখন এক রূপকমাত্র। 1905 সালের বঙ্গভঙ্গের সময়কালে এক বঙ্গসন্তানের মনের কথা ফুটে ওঠে অপরূপভাবে; মুগ্ধ করে পাঠককে আজও একইভাবে। কিন্তু এখন 2020 সালে করোনার ত্রাসে যখন ঘররুদ্ধ সমগ্র বঙ্গবাসী, এই অনিশ্চিত নিশ্চলতার মাঝে না হয় পুনরাবৃত্তি করা যাক মোদের বাংলা-মায়ের সুপ্রাচীন ইতিহাস।

মহাভারত, বৈদিকশাস্ত্র এবং অন্যান্য পুরাণগ্রন্থে সুপ্রাচীন বঙ্গের নামাঙ্কন উল্লেখ্য। সুপরিচিত মহাভারতের যুদ্ধের অবসান হয় সম্ভবত 5100 বছর পূর্বে (ভারতীয় গণিতজ্ঞ আর্যভট্ট, গ্রীক রাজদূত মেগাস্থিনিসের লিখিত ‘ইন্ডিকা’, ভারতীয় বিজ্ঞানী বি. এন. আচার, এন. এস. রাজারাম, কে. সদানন্দ ও অন্যান্যদের মতে), যার প্রারম্ভ সম্ভবত 7600 বছর পূর্বে (ভারতীয় বিজ্ঞানী পি. ভি. বারটক -এর মতে) । কিন্তু ঐ সময় এবং তার পূর্বে ও পশ্চাৎ-এ কি ছিল পশ্চিমবঙ্গে? সভ্যতা কি ছিল এখানে? এইসব প্রশ্নের সদুত্তর মেলে অপ্রত্যক্ষ প্রমানে।

সর্বসাকুল্যে 162 টি লোয়ার প্যালিওলিথিক (Lower Palaeolithic; 33 লক্ষ থেকে 3 লক্ষ বছর পূর্বে) প্রাগৈতিহাসিক স্থান উৎঘাটিত; যেগুলির বেশিরভাগই রাঢ় বাংলার পাহাড়ের পাদদেশে, নদী উপত্যকার ঢালে এবং নদীর পাড়ে পাওয়া গিয়েছে। 41 টি মধ্য প্যালেওলিথিক (Middle Palaeolithic; 3 লক্ষ থেকে 45 হাজার বছর পূর্বে), 84 টি নবপ্রস্তরযুগীয় (Neolithic; 50 হাজার থেকে 10 হাজার বছর পূর্বে) এবং 208 টি মাইক্রোলিথিক (Microlithic) প্রাগৈতিহাসিকস্থল আছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গে। এই প্রাগৈতিহাসিক স্থানের বেশিরভাগ বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম, মেদিনীপুর এবং পুরুলিয়া জেলায় অবস্থিত। সমসাময়িক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বাংলাদেশ, ভারতের বিহার, ঝাড়খন্ড, আসাম, মেঘালয়, মনিপুর, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড হইতে জ্ঞাপিত; যাহা ছিল পূর্ব ভারতে মানুষের উপস্থিতির এবং আবাসভূমির স্মারক। বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের ডিহর -গ্রামের প্রাগৈতিহাসিকস্থল ক্যালকোলিথিক (Chalcolithic) জনগোষ্ঠী (5500 থেকে 3500 বছর পূর্বে) এবং তাদের পূজা-আরাধনার নিদর্শন স্মরণীয়; যার প্রতীকী ষাঁড়েশ্বর এবং শৈলেশ্বর শিবমন্দির। এই জনগোষ্ঠীর বসবাস মহাভারতের সমসাময়িক এবং তার পরবর্তীকালের।

আধুনিক বিজ্ঞানমতে, মানুষের বিবর্তনের প্রারম্ভ প্রায় 33 লক্ষ বছর আগে। পুরাণ-মতে কিন্তু মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে প্রায় 38.9 লক্ষ বছর আগে, সত্যযুগ শুরুর সাথে সাথে। আধুনিক বিজ্ঞান যুক্তিবাদী এবং তর্ক করে প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে। তেমনই, যুক্তিবাদী মনোভাব আমাদের আরো বেশি জানতে ও বুঝতে শেখায়, তথাপি অপরকে বোঝার অবকাশ করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, আয়ুর্বেদকে না জেনে-বুঝে যখন আমরা বহুবছর ধরে অবহেলা করেছি, এখন তার গুরুত্ব বোঝা ও জানা যাচ্ছে ক্রমশ। বিজ্ঞান ও পুরাণ -এর অসামঞ্জস্যের ভিত্তি ‘প্রমাণ না খুঁজে পাওয়া’। প্রমাণ খুঁজে পাওয়া মানে ‘অবশ্যই ছিল অথবা ঘটেছিল’, তবে প্রমাণ না পাওয়া মানে হল ‘50% সম্ভাব্যতা পাওয়ার এবং 50% না পাওয়ার’ (পরিসংখ্যান শাস্ত্রের ভিত্তিতে)। কিন্তু আমাদের নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক আমরা নিজেই, যেখানে অন্য দেশের একই কাজকে সাধুবাদ জানাই সবাই ও সত্য বলে স্বীকার করা হয়। অতএব, বাংলায় মানব-জীবাশ্ম (প্রত্যক্ষ প্রমাণ) সেভাবে না পেলেও, পাওয়ার সম্ভাব্যতা 50%।

অতিকায় মানবদের এখন বিভিন্ন হলিউড চলচ্চিত্রে দেখায় এবং দেখে বেশ রোমহর্ষক অনুভূতি হয়। সবার জানা উচিৎ যে অতিকায় মানবদের প্রাচীনতম পরিচিতি লিপিবদ্ধ রয়েছে পুরাণে। পুরাণমতে, সত্যযুগে (38,93,123 থেকে 21,65,123 বছর পূর্বে) মানুষ অতিকায়-ই, যাদের গড় উচ্চতা ছিল 32 ফুট এবং গড় আয়ু ছিল প্রায় 1,00,000 বছর। ত্রেতাযুগে (21,65,123 থেকে 8,69,123 বছর পূর্বে) অতিকায় মানবদের গড় উচ্চতা ও আয়ু ছিল যথাক্রমে 21 ফুট ও 10,000 বছর; দ্বাপরযুগের (8,69,123 থেকে 5123 বছর পূর্বে) অতিকায় মানবদের গড় উচ্চতা ও আয়ু  যথাক্রমে 11 ফুট ও 1,000 বছর। শুধুমাত্র ভারত নয়; অতিকায় মানবদের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় আব্রাহামিক, আর্মেনিয়ান, বাল্টিক, ব্যাস্ক, বুলগেরিয়ান, গ্রীক, তৎকালীন স্থানীয় আমেরিকান, নর্স, রোমান এবং অন্যান্য ইউরোপীয় পুরাণে। এইসব অন্যদেশের অতিকায় মানবদের উচ্চতা ছিল 14 থেকে 7 ফুট, যা সম্ভবত দ্বাপরযুগের সমসাময়িক। কিন্তু, ভারতীয় পুরাণের নিপুন বিবরণী এবং অন্যান্য দেশের পুরাণের সাথে তার মিল কিছু থাকার পূর্বাভাস জানায়। অধিকাংশ সত্যের উন্মোচিত হওয়া এখনো বাকি। মানবজাতির যে অনুদ্ঘাটিত অধ্যায় বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে এখনো বঙ্গদেশের গঙ্গানদীর পলিমাটির নিচে চাপা এবং প্রাচীনতম ঐতিহাসিক সাক্ষ্যপ্রমাণের অন্তর্বর্তী, তার কিছু নিদর্শনের পূনর্উদ্ধার পরবর্তী যুক্তিবাদী, যুব ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের এক রাষ্ট্রধর্ম; তথা বাংলার প্রকৃত ইতিহাস উন্মোচনের এক সুবর্ণ সুযোগ।