পশ্চিমবঙ্গের কৃষিক্ষেত্রে সমস্যাগুলি ও সম্ভাব্য সমাধান

১। কৃষি ও রাজনৈতিক গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গের জনঘনত্ব দেশের সর্বাধিক (১০২৯ জন প্রতি বর্গকিলোমিটারে)। দেশের মোট ভূভাগের মাত্র ২.৭% অংশে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশের বসবাস। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে প্রতিবেশী পূর্ব পাকিস্থান তথা পরবর্তীকালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর ঘটে চলা নারকীয় অত্যাচার এক বিপুল অংশের সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারকে দেশত্যাগ করে এপার বাংলায় উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসতে বাধ্য করে। পাশাপাশি, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে, কংগ্রেস, বাম ও তৃনমূল সরকারের মদতে, পশ্চিমবঙ্গ অবৈধ মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে ওঠে। সামগ্রিকভাবে কৃষিজমির উপর ক্রমাগতঃ বেড়ে চলেছে চাপ।

ভুমিসংস্কারের ফলে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিজমি খন্ডিত হয়ে ছোট ছোট জোতে পরিনত হয়েছে। রাজ্যের ৭২% মানুষ গ্রামে বাস করেন। মোট চাষযোগ্য জমির পরিমান প্রায় ৫২ লক্ষ হেক্টর; যার মালিকানা আছে ৭১.২৩ লক্ষ কৃষক পরিবারের হাতে, এবং গড় কৃষক পরিবার প্রতি জমির পরিমান ০.৭৭ হেক্টর। রাজ্যের মোট চাষীর ৯৬% ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষী,অর্থাৎ প্রায় ৬৮ লক্ষ পরিবার ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষী পরিবার; যা রাজ্যের মোট পরিবারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ।

West Bengal Estate Acquisition Act, 1953 দ্বারা ২৬.৪৮ লক্ষ একর এবং West Bengal Land Reforms Act, 1955 দ্বারা ৩.৯৮ লক্ষ একর কৃষিজমি সরকারিভাবে অধিগৃহীত হয়েছে । এর মধ্যে,এ যাবৎ প্রায় ১১ লক্ষ একর কৃষিজমি, ৩৩ লক্ষ পাট্টাদারের মধ্যে বন্টিত হয়েছে। পাট্টাদার প্রতি প্রাপ্ত জমির পরিমান গড়ে ১ বিঘা মাত্র! স্বাভাবিকভাবেই এই ক্ষুদ্র জমি থেকে পাওয়া আয় কোনভাবেই পাট্টাপাওয়া পরিবারগুলির দারিদ্র মুক্তি ঘটাতে পারেনি। আর সে কারনেই, ভুমি সংস্কারের সাফল্য প্রচারে বাম দলগুলির রাজনৈতিক লাভ হলেও, তা গ্রাম বাংলার দারিদ্র হ্রাসে কোন সদর্থক ভূমিকা পালন করেনি। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গে ১১.১৮ লক্ষ একর কৃষিজমিতে,১৫.২০ লক্ষ নথীভুক্ত বর্গাদার আছেন। অর্থাৎ,এই রাজ্যের প্রায় ৪১% পরিবার হয় ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষী পরিবার; অথবা, নথীভুক্ত বর্গাদার পরিবার। রাজ্যে, ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষী তথা নথীভুক্ত বর্গাদারদের এই বিপুল সংখ্যা, এই অংশকে রাজ্য রাজনীতির নির্নায়ক শক্তি করে রেখেছে।

২। পশ্চিমবঙ্গে কৃষির সমস্যা

ক। উপরের আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে, এই রাজ্যে কৃষির নিয়ন্ত্রন সম্পূর্নভাবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী; এবং রেকর্ডেড বর্গাদারদের হাতে আছে। এই অংশ মূলতঃ দারিদ্রের কারনে, আধুনিক কৃষির ঝুঁকি গ্রহন করতে ভয় পান; এবং চিরাচরিত পদ্ধতির চাষে আবদ্ধ আছেন।

খ। পাশাপাশি কৃষি উপকরন যেমন সার, বীজ, পরামর্শ সহ যন্ত্রাদির অপ্রতুলতা, প্রশিক্ষন, ঋন, বীমা’র অভাব; অভাবী বিক্রি, প্রভৃতি কারনে চাষ থেকে যথেষ্ট লাভ হচ্ছে না। বীজের প্রশ্নে এই রাজ্য এখনো অন্য রাজ্য বিশেষতঃ পাঞ্জাবের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

গ। ধান চাষের উপর অত্যাধিক ঝোঁক, পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফসল, ফল, ফুল প্রভৃতি চাষ সম্পর্কে সচেতনতা ও সহায়ক ব্যবস্থাপনা’র অভাব; কৃষকের লাভের পথে বড় অন্তরায়।

ঘ। সেচ পরিকাঠামোর দুর্বলতার জন্য রাজ্যের এক বড় অংশ বন্যাপ্রবন। সেচ পরিকল্পনায় আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গীর অভাব আছে। কম বৃষ্টি বা বেশী বৃষ্টি রাজ্যের এক বড় অংশের কৃষককে প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্থ করে; তা সত্ত্বেও, বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভর করে এলাকাভিত্তিক কৃষি-পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিরাট ঘাটতি আছে।

ঙ।একইরকম ভাবে আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে খরিফ তথা রবি মরসুমের দৈর্ঘ্যের যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা মাথায় রেখে এলাকাভিত্তিক কৃষি-পরিকল্পনা হচ্ছে না। ফলতঃ চিরাচরিত প্রক্রিয়ায় চাষ করতে গিয়ে চাষী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

চ। অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সার ব্যবহার জমির উর্বরতা তথা জমিতে (খনিজ লবনের)অনু-খাদ্য তথা উপকারি ব্যাক্টেরিয়া’র মাত্রায় হ্রাস ঘটিয়েছে। চাষ করতে গেলে আরো বেশী সার ও খনিজ লবন প্রয়োজন হচ্ছে, যার ফলে চাষের খরচ বাড়ছে; কিন্তু উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়ছে না। মাটি পরীক্ষা করে চাষের সিদ্ধান্ত গ্রহনের বিষয়টি এখনো অবহেলিত।

ছ। ফসল মজুত রাখার ও প্রক্রিয়াকরনের পরিকাঠামোর অভাবে এক বিরাট অংশের ফুল, ফল, সব্জী নষ্ট হচ্ছে; অথবা চাষী অলাভজনক দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জ। গবাদি প্রানীপালক উৎপাদিত দুধের যে দাম পাচ্ছেন, তা খোলাবাজারে দুধের বিক্রয়মূল্যের প্রায় অর্ধেক। সঠিক দাম না পেয়ে প্রানীপালক অনুৎসাহিত হয়ে গাভী পালন ছেড়ে দিচ্ছেন। ফলে বাজারে ভেজাল দুধের কারবার বেড়ে চলেছে, যা জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে বিপদজনক।

ঝ। সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে গরু চুরি, গবাদি প্রানীপালনের অন্যতম বড় বাধা। বহু প্রানীপালক এর ফলে গাভী পালন ছেড়ে দিচ্ছেন। এই চুরিতে শাসক দলের নেতৃত্ব, শাসক দলের জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের অংশিদারিত্ব আছে, তাই চুরির অভিযোগগুলি থানা গ্রহন করে না।

ঞ। প্রানী খাদ্য উৎপাদনে সরকারি সহায়তার অভাবে, গবাদি প্রানী খাদ্য’র দাম বেড়ে চলেছে; পাশাপাশি গুনমানের ক্ষেত্রেও সমস্যা থাকছে। এর প্রভাবে খরচ বাড়লেও, দুধের পরিমান বা গুনমান অপরিবর্তিত থাকছে। সবুজ প্রানীখাদ্য উৎপাদনের কোন সময়োপযোগী সহায়তা প্রানীপালক পাচ্ছেন না। দুধ মজুত রাখার বাল্ক কুলার ও প্রক্রিয়াকরনের পরিকাঠামোর অভাবে, দুগ্ধজাত পন্যের দাম বেড়ে চলেছে।

ট। ডিম উৎপাদনে রাজ্যের ঘাটতি মেটানোর প্রশ্নে রাজ্য সরকারের পরিকল্পনায় গলদ আছে। মুরগী,ছাগল পালনের মাধ্যমে দারিদ্র দূরীকরনের ব্যপক সম্ভাবনা থাকলেও; বিষয়গুলি নিয়ে বাস্তবসম্মত, বাজার অভিমুখী পরিকল্পনা নেই।

ঠ। রাজ্যের জলাশয়গুলি, মাছ উৎপাদনে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে, মাছ উৎপাদনে রাজ্য স্বয়ংসম্পূর্ন হতে পারত। উপযুক্ত গুনমানের মাছ-চারা উৎপাদনকেন্দ্রের অপ্রতুলতা, উপযুক্ত গুনমানের যথেষ্ট জলাশয়ের অভাব, সাথে মাছ মজুত রাখার বরফের অভাব বা বাজারীকরনের পরিকল্পনার অভাব, মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। মাছ চাষীদের প্রশিক্ষন তথা ঋনের বিষয়টিও ভীষনভাবে অবহেলিত।

ঠ। চা-বাগান পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সে একটি গুরুত্বপূর্ন আর্থ-সামাজিক বিষয়। সংগঠিত ২৭৩ টি চা বাগানের জনসংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষ। ২ লক্ষ ৬২ হাজার শ্রমিক এই চা বাগান গুলির সাথে যুক্ত। দেশের প্রায় ২০% চা বাগান এই রাজ্যে, যেখানে দেশের প্রায় ২৬% চা উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি ছোট ছোট অসংগঠিত বহু চা বাগান এই এলাকায় গড়ে উঠছে। সংগঠিত চা বাগানগুলি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হবার ফলে, প্রতি মুহুর্তে এদের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। ২০০২ সাল থেকে ১০০০ জনের বেশী শ্রমিক পরিবারের সদস্য সংগঠিত চা বাগানগুলিতে অনাহারে মারা গেছেন। সংগঠিত চা বাগানগুলির মূল সমস্যাগুলি হল-

১) কম উৎপাদনশীলতা – চা উৎপাদন একটি শ্রমিক নির্ভর ব্যবস্থা। শ্রমিকের সুস্বাস্থ্য অধিক উৎপাদনশীলতার জন্য একান্ত আবশ্যক। কিন্তু অনিয়মিত তথা কম মজুরী, অস্বাস্থ্যকর ঘর, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও গনবন্টন ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার কারনে চা শ্রমিকদের মধ্যে অনাহার তথা পুষ্টির অভাব একটি সাধারন সমস্যা, যা তাদের কর্মক্ষমতা হ্রাস করে, ফলে চা উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।

২) চা শ্রমিকদের অধিকাংশই অদক্ষ। কোন প্রশিক্ষন কখনো পাননি। আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার প্রায় হয় না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের কর্মকুশলতা কম। জলপাইগুড়ির একজন চা শ্রমিক দৈনিক যেখানে মাত্র ২৪ কেজি চা পাতা তুলতে পারেন; সেখানে একই সময়ে কাজ করে কিনিয়া এবং জিম্বাবোয়ের একজন চা শ্রমিক যথাক্রমে ৪৫ কেজি ও ৬৮ কেজি চা পাতা তোলেন।

৩) সংগঠিত চা বাগানগুলির মালিকপক্ষ পুরানো চা গাছ তুলে ফেলে নতুন গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে অনীহা দেখাচ্ছেন, ফলে চা-উৎপাদনশীলতা মার খাচ্ছে।

৪) গ্রীন টি’র চাহিদা উত্তোরত্তর বাড়তে থাকায় চিরাচরিত কালো চায়ের চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে।

৫) শ্রমিক অসন্তোষের কারনেও চা-উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে, অসংগঠিত চা বাগানগুলিতে গুনমান সঠিক থাকছে না। বাগান থেকে চা তোলার ১২ ঘন্টার ভিতর প্রক্রিয়াকরন না হলে, পাতা নষ্ট হয়ে যায়। অসংগঠিত চা বাগানগুলি তাই সংগঠিত চা বাগানের প্ল্যান্টে চা-পাতা বিক্রি করতে বাধ্য হয়; এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই অভাবী বিক্রির শিকার হয়।

ড। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, মালদা, হুগলী এবং উত্তর ২৪-পরগনা জেলার প্রায় ২৩ লক্ষ পরিবার পাট চাষের সাথে যুক্ত। সারা দেশের প্রায় তিন চতুর্থাংশ পাট পশ্চিমবঙ্গে উৎপাদিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে ৬১ টি চটকলে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন। ৭০ এর দশকের শেষ ভাগ থেকে,তৎকালিন বাম সরকার চটকলের আধুনিকিকরনের বিষয়ে উদাসীন থাকায় সেই সময় থেকে পাটশিল্পের দুর্গতির শুরু।প্লাস্টিক সহ সিন্থেটিক ফাইবারের ব্যবহারের ফলে চটের ব্যাগের ব্যবহার ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে সস্তায় পাট এবং পাটজাত দ্রব্য আমদানীর ফলে পাটচাষী তথা শিল্প উভয়ই মার খেয়েছে।

৩। পশ্চিমবঙ্গের কৃষিনীতি

ক। কৃষি তথা কৃষকের উন্নতির জন্য যে পদক্ষেপ জরুরী

১) এলাকা ভিত্তিক চাহিদা, আবহাওয়া অনুযায়ী কৃষি পরিকল্পনা,

২) কৃষকের জ্ঞান, দক্ষতা বৃদ্ধি,

৩) পরিকাঠামো, প্রযুক্তির মানোন্নয়ন,

৪) তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চাষীর উপযোগী প্রযুক্তি, আবহাওয়া, উৎপাদন, বাজার প্রভৃতি তথ্যভান্ডার গঠন,

৫) কৃষি-উৎপাদন সংরক্ষনের ব্যবস্থা,

৬) চাষীর সাথে প্রয়োজনীয় ঋন, বীমা সংযুক্তি,

৭) মাটি, পরিবেশ তথা ভূ-গর্ভস্থ জলের সংরক্ষন,

৮) প্রয়োজনভিত্তিক গবেষনার বিষয় চিহ্নিত করে, সেগুলি সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহন,

৯) বিপনন, প্রযুক্তি সহ সমস্ত প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে চাষীদের পেশাদারি সহায়তা প্রদান,

১০) প্রক্রিয়াকরনের মাধ্যমে মূল্যযুক্তি, তথা উৎপাদনকে রপ্তানিযোগ্য করে তোলা,

১১) সরকারি বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় ঘটিয়ে সমস্ত প্রযুক্তি ও পরিষেবা কৃষকের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া,

১২) শক্তিশালী Monitoring এবং Evaluation ব্যবস্থা প্রনয়ন।

১৩) গবাদি প্রানী চুরি তথা পাচারের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রনয়ন।

খ। উৎপাদক গোষ্ঠী (Producer company / producer group)গঠন

Ø রাজ্যের আবহাওয়া ও বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে এলাকাভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা জরুরি।এই পরিকল্পনা রূপায়নের জন্য অসংগঠিত ক্ষুদ্র চাষিদের সংগঠিত করে, মালিকানাভিত্তিক উৎপাদক গোষ্ঠী (Producer company / producer group) গঠন করতে হবে। এই উৎপাদক গোষ্ঠী পরিচালিত হবে ক্ষুদ্র চাষিদের দ্বারা।৫০০-১০০০ জন ক্ষুদ্র চাষিদের সংগঠিত করে, প্রতিটি উৎপাদক গোষ্ঠী গঠন করা যেতে পারে।

Ø ব্লক, জেলা তথা রাজ্য স্তরে উৎপাদক গোষ্ঠীগুলির সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান গঠন করা যেতে পারে।

Ø প্রাথমিকভাবে, ৩-৫ বছর উৎপাদক গোষ্ঠী’র কাজে সহায়তার জন্য পেশাদার পরামর্শদাতা রাখতে হবে।

Ø উৎপাদক গোষ্ঠী পরিচালনায় কোন সরকারি নিয়ন্ত্রন থাকবে না; কিন্তু এই সংস্থাগুলি সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারী দপ্তর ও পেশাদার সংস্থা দ্বারা নিয়মিত পর্যবেক্ষনের আওতায় থাকবে।

Ø একটি Dedicated Web Portal এ উৎপাদক গোষ্ঠীর তথ্যাবলী নিয়মিত আপলোড করতে হবে। তথ্যাবলী নিয়মিত আপলোড করার জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হবে।

Ø উৎপাদক গোষ্ঠী সংক্রান্ত অভিযোগ মিমাংসার জন্য Dedicated অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাপনা থাকবে। অনলাইন এবং অফলাইন উভয় প্রক্রিয়াতেই অভিযোগ নথিবদ্ধ করা যাবে। অভিযোগের ১৫ দিনের মধ্যে বিষয়টি মিমাংসা করতে হবে।

Ø উৎপাদক গোষ্ঠীগুলির performance এর উপর ভিত্তি করে স্কোরিং করা হবে, এবং এই স্কোরের সাথে সরকারী সহায়তাগুলি লিঙ্ক করে, উৎপাদক গোষ্ঠীগুলিতে পজিটিভ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তথা পেশাদারিত্ব বাড়ানো হবে।একইরকম ভাবে উৎপাদক গোষ্ঠীগুলির অন্তর্গত চাষীদের স্কোরিং করা হবে।

Ø বিভিন্ন সরকারী স্কীমগুলি এই ধরনের উৎপাদক গোষ্ঠী মারফৎ রূপায়নে জোর দেওয়া হবে।

Ø সংশ্লিষ্ট সরকারী দফতরকে এই ধরনের উৎপাদক গোষ্ঠী গঠন তথা দেখভালের বাৎসরিক লক্ষমাত্রা দেওয়া হবে। আধিকারিকদের প্রমোশনের বিষয়টি, তাদের তদারকিতে functioning উৎপাদক গোষ্ঠীর performance এর সাথে লিঙ্ক করা যেতে পারে।

উৎপাদক গোষ্ঠী ও তাদের সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান যে কাজগুলি সম্পাদন করবেঃ-

১) কৃষি উপকরন যেমন সার, বীজ, প্রভৃতি পাইকারী হারে বাজার থেকে কিনে উৎপাদক-গোষ্ঠী অন্তর্গত ক্ষুদ্র চাষিদের সরবরাহ করবে, ফলে চাষীরা বাজার থেকে কম দামে কৃষি উপকরন পাবেন, পাশাপাশি তাদের এগুলি কেনার জন্য বাজারে যেতে হবে না। উপকরনের গুনমান নিশ্চিত করা যাবে, যা ব্যক্তি চাষীর পক্ষে সম্ভব হত না।

২) উৎপাদক-গোষ্ঠী,আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ক্ষুদ্র চাষিদের প্রশিক্ষিত করবে। আধুনিক কৃষির প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করবে। এবং এই প্রয়োজনে সরকারি দপ্তর, কৃষি-বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্র, অন্যান্য সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে।

৩) Bank, NABARD, SFAC, Co-operative Bank তথা অন্যান্য সরকারী বেসরকারী আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় সাধন করে কৃষান ক্রেডিট কার্ড সহ ঋন, বীমা’র ব্যবস্থা করবে; এবং ঋনখেলাপি আটকাতে ঋনগুলি নিয়মিত নজরদারিতে রাখবে।

৪) মাটি পরীক্ষা, সার-ব্যবহার পরিকল্পনা, চাহিদা-ভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা, বীজ উৎপাদন, সেচ পরিকল্পনা, ফসলের রোগ নির্নয় ও সেই সংক্রান্ত সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থাপনা তৈরী ও পরিচালনা করবে।

৫) ফুল, ফল, সব্জী মজুত রাখার ও প্রক্রিয়াকরনের ব্যবস্থা করবে। মশলা, তেল, আটা, ডাল, প্রভৃতি প্রক্রিয়াকরন করবে। আলু, পেঁয়াজ মজুত রাখার ব্যবস্থা করবে।

৬) ন্যুনতম সহায়ক মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে, তা নিকটবর্তী রাইসমিলে প্রক্রিয়াকরন করে, উৎপাদিত চাল এফ সি আই সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প যেমন মিড ডে মিল, আই সি ডি এস, পি ডি এস (খাদ্য সুরক্ষা সহ বিভিন্ন স্কীমে সরবরাহের জন্য)এ সরবরাহ করার ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি, খোলা বাজারে বিক্রয় তথা অন্য রাজ্যে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করবে।

৭)এলাকায় উৎপাদিত ফুল, ফল, সব্জী, মশলা, তেল, আটা, ডাল, চাল প্রভৃতি উৎপাদক গোষ্ঠী পরিচালিত বিপনন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রয় করবে। বিপননের কাজে e-NAM এর সহায়তা নেওয়া হবে।

৮) দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুজরাটের আমূল বা অন্ধ্রের মূলকানুর ডেয়ারী, উৎপাদক গোষ্ঠীর মাধ্যমে সফল উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে;যার ফলে ঐ রাজ্যগুলি যেমন দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ন হয়েছে, তেমনি প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই রাজ্যে উৎপাদক গোষ্ঠীর মাধ্যমে দুধ তথা দুগ্ধজাত পন্য উৎপাদনের এক বিরাট সম্ভাবনা আছে।

৯) উৎপাদক গোষ্ঠীর মাধ্যমে ডিম উৎপাদন, ছাগল পালন, মাছ চাষ প্রভৃতি বিষয়গুলি সম্পাদন করা সম্ভব হলে, এই রাজ্য প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ডিম,মাছ, মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ন হবে তাই নয়; পার্শ্ববর্তী রাজ্য তথা দেশে এগুলি রপ্তানিও করতে পারবে।

১০) উৎপাদক গোষ্ঠীর মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে জৈব-চাষ ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য-সচেতন ক্রেতাদের মধ্যে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত সব্জি, ফল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধের ব্যপক চাহিদা থাকলেও, তার যোগান সীমিত।

গ। চা-বাগানের সমস্যা নিরসন

চা-বাগানের সমস্যা, একটি আর্থ সামাজিক বিষয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য তিনটি পদক্ষেপ জরুরী।

১) শ্রমিক সুরক্ষা – চা বাগানের শ্রমিকদের আবাসন, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, খাদ্য-সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য-বীমা, জীবন তথা দুর্ঘটনা বীমা, পেনসন, ১০০ দিনের কাজ সহ দেশের সমস্ত কল্যানমুখী যোজনার সাথে যুক্ত করতে হবে।

২) চা বাগান আধুনিকিকরন – উন্নত প্রযুক্তি, যন্ত্রের ব্যবহারের সাথে শ্রমিকদের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে চা বাগানের আধুনিকিকরন করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিনের পুরানো গাছগুলি তুলে সেখানে উন্নত প্রজাতির নতুন চারা রোপন করতে হবে।

৩) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চা-উৎপাদন করতে হবে। চা অকসন সেন্টারগুলি যাতে আরো কার্য্যকরী ভূমিকা নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন অকসন সেন্টার খুলতে হবে।

ঘ। পাট-চাষের সমস্যা নিরসন

প্লাস্টিকের অতি ব্যবহারের ফলে, পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে; সেই প্রশ্নে পাট জাত দ্রব্য পরিবেশ বান্ধব হওয়ায়, এ ব্যপারে সরকারি গনমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করে সাধারন মানুষকে পাট জাত দ্রব্য ব্যবহারে উৎসাহিত করা যেতে পারে। পাটের অন্যান্য ব্যবহার বিষয়ে আরো গবেষনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত দ্রব্য আমদানির বিষয়টি বিবেচনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, অতিরিক্ত পাটচাষীদের চিহ্নিত করে বিকল্প লাভজনক চাষের উৎপাদক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহন করা যেতে পারে। পাটশিল্পের আধুনিকিকরনের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহন করা যেতে পারে; যার মাধ্যমে এই রাজ্যের পাটজাত দ্রব্য অন্য রাজ্য বা বিদেশে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজের স্থান করে নিতে পারে।