পঞ্চদশ অর্থকমিশনের আলোকে পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থা

১৯৫০ সালে সংবিধান প্রণেতারা সুপারিশ করেন সংবিধান রচনার দু’বছরের মধ্যে অর্থকমিশন গঠন করতে হবে। সংবিধানের ২৮০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে ১৯৫১ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রথম অর্থ কমিশন গঠন করেন, যার সভাপতি হন ক্ষিতিশ চন্দ্র নিয়োগী (কে সি নিয়োগী)। পরবর্তী সময় সি ডি দেশমুখের পর তিনি নেহেরু মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হন। কিন্তু নেহেরু-লিয়াকত চুক্তিতে ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী পদত্যাগ করলে কে সি নিয়োগীও পদত্যাগ করেন। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আর্থিক সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য, বলা যায় কর বিন্যাস ও আর্থিক দায় বহন করার কথা অর্থ কমিশন বিবেচনা করে। কমিশনের প্রধান কাজ দেশের সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ করা, সরকারি খরচের মান উন্নয়ন এবং আর্থিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করা।

চতুর্দশ অর্থকমিশন রাজ্যের বরাদ্দ ৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪২ শতাংশ করে। পঞ্চদশ অর্থকমিশনের কাজ জিএসটি অনুসারি যুগে প্রবেশ করেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের কাছ থেকে করের কিছু ক্ষমতা কেড়ে জিএসটি কাউন্সিলকে দেওয়া হয়। জিএসটি কাউন্সিলের যুগে অর্থ কমিশনকে কাজ করতে হবে, যার সভাপতি নন্দকিশোর সিংহ (এনকে সিংহ)।

অর্থকমিশনের ‘টার্মস্ অফ রেফারেন্স’ (Terms of reference) ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করেছেন। এতদিন পর্যন্ত ১৯৭১ সালকে ভিত্তি বছর হিসাবে বিবেচনা করা হত। বর্তমানে তা ২০১১ সালে জনভিত্তিকে ধরে নেওয়া হয়েছে। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্র-সহ ১৩টি রাজ্য ১৯৭১ সালের পক্ষে, হরিয়ানা ও গুজরাট-সহ নয়টি রাজ্য ২০১১ সালের পক্ষে এবং সাতটি রাজ্য জনসংখ্যাকে ভিত্তি করার পক্ষে নয়। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলি মনে করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সুফল তারা পাবে না।

২০০৩ সালে Financial Responsibility and Budget  Management  Act., 2003 পাশ হয় এবং তাকে অনুসরণ করে ২০১০ সালে West Bengal Financial Responsibility and Budget  Management  Act, 2010 পাশ হয়। কিন্তু বাম জমানার অবসানের পর আর্থিক শৃঙ্খলা মাথায় তুলে রাখা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ‘Medium Term Fiscal Policy Statement and Fiscal Policy Strategy Statement’ চালু হয়। ১৯৭৭ সালে বাম সরকার ক্ষমতায় আসে ৪৫,০০০ কোটি টাকার দেনা নিয়ে এবং ২০১১ সালে ১ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকার দেনা রেখে যায়। ২০১৮ সালে সেই দেনা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩ লক্ষ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। যে দেনার কথা বর্তমান সরকার বলছে ৩৪ বছরের তা আসলে ৬৪ বছরের ক্রমপুঞ্জীভূত দেনামাত্র।

২০১২-১৩ অর্থবর্ষ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষ পর্যন্ত বেতন ও পেনশন খাতে রাজ্য সরকার নিজস্ব বাজেট বরাদ্দের ১২,৩৫৪ কোটি টাকা খরচ করেনি। অথচ পশ্চিমবঙ্গ এমন রাজ্য যেখানে বিভিন্ন স্তরে প্রায় ৭০,০০০ শিক্ষকপদ আজও শূণ্য!

 

২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে রাজ্য চারটি খাতে- ঋণ পরিশোধ, বেতন, পেনশন ও ভর্তুকিতে ব্যয় করেছে ১ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা, অথচ তার নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহ ৫৫,৭৪৮ কোটি টাকা, প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের দ্বিগুণ চারটি খাতেই ব্যয় হয়েছে। রাজ্যের বর্তমান ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয় ৪৫,০০০ কোটি টাকা। যার মানে রাজ্যের নিজস্ব আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধ করতে। ২০১১-১২ অর্থবর্ষে কেন্দ্রীয় করে রাজ্যের প্রাপ্য ১৮,৫৪৭ কোটি টাকা থেকে তিনগুণ বেড়ে ২০১৮-১৯ বাজেটে দাঁড়িয়েছে ৫৫,৪৩৭ কোটি টাকা। আবার কেন্দ্রীয় সহায়তা ২০১১-১২ অর্থবর্ষে ১৩,৪৪৪ কোটি টাকা থেকে আড়াই গুণ বেড়ে ২০১৮-১৯’এ দাঁড়িয়েছে ৩২,৭১৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে একই সময় রাজ্যের রাজস্ব ২২,৯৩৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৫,০০০ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য, জিএসটি’র বিরোধিতা করেও রাজ্য অতিরিক্ত ৫০০০ কোটি টাকা পেয়েছে এবং তেলের দামের বৃদ্ধির বিরোধিতা করে অতিরিক্ত ৫,০০০ কোটি টাকা পেয়েছে। বহু ক্ষেত্রেই রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় অনুদান যথাসময়ে খরচ করতে পারেনি বা প্রয়োজনীয় নথিপত্র দাখিল করতে না পারার জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দর সদব্যবহার করতে পারেনি।

২০১১-১২ অর্থবর্ষের পরিবর্তে ২০০৪-৫ অর্থবর্ষকে ভিত্তি ধরে উন্নয়নের রকেট গতি প্রচার করতে রাজ্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের ১০ কোটি জনসংখ্যার ৮ কোটি মানুষ অন্তোদয় প্রকল্প এবং খাদ্য সুরক্ষা প্রকল্পে ২টাকা কিলো দরে চাল পায়, যার ২৯.৬৭ টাকা কেন্দ্র, ২টাকা উপভোক্তা এবং ১টাকা রাজ্য সরকার দিয়ে থাকে। অর্থাৎ ৮০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। কিন্তু রাজ্য বলছে ১৯.৯৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। প্রকৃত চিত্রের বিপরীত অভিঘাত প্রকাশিত হচ্ছে।

সামাজিক ও পরিকাঠামো উন্নয়নে রাজ্যের বরাদ্দ জাতীয় আয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম পরিমান। উপরন্তু বিগত বাজেটে পরিকল্পনা ও পরিকল্পনা বহির্ভূত খাত মিশিয়ে দিয়ে মিত্র মশাই ধোঁয়াশার জাল বুনেছেন।

১৯৮৮ সালে গঠিত সারকারিয়া কমিটির রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে এস আর বোম্বাই বনাম ইউনিয়ন অফ্ ইন্ডিয়ার মামলার রায় এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

অর্থকমিশন জনভিত্তি, জনঘনত্ব ও উন্নয়ন বিবেচনার মধ্যে আনার সাথে সাথে কর ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ও সার্বভৌমত্বের অঙ্গীকারে সেই রাজ্যকেই বরাদ্দ বৃদ্ধি করুক, যেখানে আর্থিক শৃঙ্খলা কঠোরভাবে অনুশীলন করা হয় খেলা, মেলা, সৌন্দর্যায়ন, পার্ক, সিভিক ভলেন্টিয়ার, ক্লাবের আবর্তে রাজ্যকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে না নিয়ে গিয়ে। যে রাজ্য সঠিক আর্থিক উন্নয়ন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিক্ষা ও সেবাক্ষেত্রের মেলবন্ধনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাস, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, রাস্তাঘাটের মতো বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থকমিশনের কাজে সাংবিধানিক অঙ্গীকার বজায় রাখবে। তবেই রাজ্যের রাহুমুক্তি ঘটবে।