তিন তালাক: শেষ নয়, সবে শুরু

‘ইতনে বাজু, ইতনে সর, গিনলে দুশমন ধ্যায়ান সে, হারেগা ও হর বাজি, যব খেলেঁ হাম জি জান সে’।

‘ম্যায় আজাদ হুঁ’- এই গানটা আমার অনেকদিন থেকে খুব প্রিয়। পর্দায় অমিতাভ বচ্চনকে যত বার গানটা গাইতে দেখেছি, তত বার মনে হয়েছে একটা একা মানুষ কত অসাধ্য সাধন করতে পারে। আজ সুপ্রিম কোর্ট-এর এই ঐতিহাসিক রায়-এর পর মনে হচ্ছে মুসলিম মহিলাদের জন্যে ওই গানটাই ‘থিম সং’ হয়ে উঠতে পারে। মুসলিম পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম মহিলাদের এই জয় আর এক বার ওই আপ্তবাক্যটিকেই সামনে নিয়ে এল, আমরা যত বার নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে লড়বো, তত বারই এই ধরনের লড়াইতে জিতবো। যে লড়াই আমরা মেয়েরা হৃদয় দিয়ে লড়বো, সেই লড়াইতে কেন হেরে যাবো প্রতিপক্ষের কাছে?

একবার ভেবে দেখবেন, মুসলিম মহিলাদের লড়াইটা কতটা কঠিন ছিল। গোটা মুসলিম পুরুষ তন্ত্রই তো আমাদের বিরুদ্ধে ছিল, বিরুদ্ধে ছিলেন খোদ সুপ্রিম কোর্ট-এর প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর। কিন্তু এই জন্যেই আমি চিরকাল ভারতীয় গণতন্ত্রকে সম্মান করি, বিশ্বাস করি গণতন্ত্রের মূল শক্তিকে। যে শক্তি আজ আমাদেরকে সুপ্রিমকোর্টে ৩:২ ভোটে জিতিয়ে দিল। জিতিয়ে দিল কপিল সিবব্বাল, সলমান খুরশিদ-এর মতো নামী আইনজীবীদের যাবতীয় যুক্তিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে। মনে রাখবেন, কপিল সিব্বালরা সুপ্রিম কোর্টে ঠিক কী কী বলেছিলেন তিন তালাক প্রথাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে। আমাদের মুসলিম মহিলাদের সমানাধিকারের আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিয়ে কংগ্রেসের এই প্রাক্তন মন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তিন তালাক ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলেছিলেন ১৪০০ বছরের এই পুরনো প্রথাকে বাতিল করা নাকি কোরান ‘পুনর্লিখনের’ সমান।

দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট-এ কপিল সিব্বাল যখন সওয়াল করেছিলেন, তখন আমরাও দিল্লিতে ছিলাম যন্তরমন্তর-এ ধর্না দেখাবো বলে। সুপ্রিম কোর্ট-এ কপিল সিব্বালের সওয়াল শুনে আমি যখন বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন এক টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, একজন মুসলিম হিসাবে, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের আইনজীবী কপিল সিব্বালের বক্তব্য সম্পর্কে আমার কী প্রতিক্রিয়া? দেশের প্রাক্তন মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রীর গা ঘিন ঘিন করা যুক্তিগুলি শুনতে শুনতে, যে যুক্তিগুলি শুনলে দেশের আর কোনও মহিলার কপিল সিব্বাল কে কোন দিন একটা ভোটও দেওয়া উচিত হবে না, সেই বিষয়ে কতটা তিক্ত কথা বলবো, তাই নিয়ে আমার দ্বিধা ছিল। কিন্তু তারপরে টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিককে আমি হেসেই বলেছিলাম, সারদা মামলা থেকে নারদায় অভিযুক্তদের পক্ষে সওয়াল, কোনটাতেই আইনজীবী হিসেবে কপিল সিব্বাল সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট-এ জিততে পারেন নি। অতএব এই মামলাতেও আমরা তাঁর ‘পারফরমেন্স’-এর উপর ভরসা রাখতে পারি। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পর মনে হচ্ছে, বিরাট কোহলির মতোই কপিল সিব্বাল-এর ‘ধারাবাহিকতা’ও দুর্দান্ত।

কপিল সিব্বালকে ছেড়ে দিন, কি করে ভুলে যাবেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের কথা? আমাদের শহর কলকাতায় সম্মেলন করে শুধু তাঁরা তিন তালাক টিকিয়ে রাখার পক্ষে যাবতীয় ‘অমানবিক’ সব যুক্তিই সব পেশ করেন নি, আমরা যারা, মানে যে সব মুসলিমরা তিন তালাকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলাম, তাদের প্রায় ‘মুর্তাদ’ ঘোষণা করে দিয়েছিল। আমাদের মুসলমান ধর্মের বাইরে তো তারা বারই করে দিয়েছিল, এমনকি বিভিন্ন সামাজিক জায়গায় কিভাবে হেনস্থা করা যায় তারও যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে গোটা দেশ জুড়ে সভা, সমিতি, ধর্না করে গিয়েছি। হায়দ্রাবাদ থেকে পুণা, মুর্শিদাবাদ থেকে দিল্লি, আমাদের জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটি সর্বত্র মুসলিম মহিলাদের অধিকার রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচী নিয়েছে।

আমরা, মুসলিম মহিলারা, যত কর্মসূচী নিয়েছি, উল্টোদিক থেকে আঘাতও এসেছে তত তীব্র। মনে আছে কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের যখন বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছিল, তখন চমৎকার জবাব দিয়েছিল আমার পাশে বসে থাকা মেদিনীপুরের স্কুল শিক্ষিকা সালিমা হালদার। সালিমা বলেছিল, “আপনারা কি বুঝবেন মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীন সমস্যাটা? বহু বিবাহ আর তিন তালাকের খাঁড়া কিভাবে আমাদের মতো মুসলিম মেয়েদের ঘাড়ের উপর ঝোলে? আমার নিজের বাড়িতে এক শ্বশুরের দুই বিয়ে, আর এক খুড়শ্বশুরের তিন বিয়ে। আমার শাশুড়িরা রোজ বাড়িতে কি আতঙ্ক নিয়ে বাস করেন, সেটা আপনারা বুঝবেন কি করে?” সালিমার কথায় কলকাতা প্রেস ক্লাবে যেমন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ভরে গিয়েছিল, তেমনি আমার হৃদপিন্ডটাও বোধহয় চুপ করে গিয়েছিল। সত্যি আমরা যারা শহরে থাকি, আধা শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, তারা কতটা জানি এদেশের মুসলমান মেয়েদের জীবনের বারোমাস্যা?

যেদিন দিল্লিতে যন্তরমন্তরে ধর্না দিচ্ছিলাম, সেদিন আমার পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ে, জওহরলাল নেহেরুর ইউনিভার্সিটির সূত্রে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মহিলাদেরও বলেছিলাম ধর্নায় আসতে। তাদেরই সূত্র ধরে একটি মেয়ে এসেছিল, যার নাম ফতিমা খাতুন। আট মাসের অন্ত:সত্ত্বা সেই তরুণীকে যন্তরমন্তরে আমাদের ধর্নায় এসে বসতে দেখে আমার নিজেরই কেমন অবাক লেগেছিল। সেটা মে মাস, সুপ্রিম কোর্টে তিন তালাক নিয়ে শুনানি চলছিল, আর বাইরে গ্রীষ্মের দাবদাহ। গ্রীষ্মের সেই প্রবল দুপুরে যন্তরমন্তরে আমাদের ধর্নায একজন অন্ত:সত্ত্বা মুসলিম মহিলাকে বসে থাকতে দেখে আমি যথেষ্টই বিস্মিত ছিলাম। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এই অবস্থায় তুমি ধর্নায় এলে কি করে?’ নিজের যাবতীয় আড়ষ্টতা ভেঙে ফতিমা আমায় পরিষ্কার বলেছিল, তার শাশুড়িই তাকে জোর করে তিন তালাকের বিরুদ্ধে ধর্নায় বসতে পাঠিয়েছে। ফতিমার কথাটা আজও আমার কানে বাজে। “শাশুড়ি বলল, বেটি আমার তো কিছু হলো না। তোর সামনে একটা সুযোগ আছে, তুই যা। যদি এবারে পরিবর্তন হয়ে যায় তাহলে তোদের জন্যে জীবন বদলে যাবে।”

যন্তরমন্তরে মুসলিম মহিলাদের ওই ধর্নার ছবিটা পরদিন ভারতবর্ষের প্রায় সব কাগজে  বেরিয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে পরিতৃপ্তির বিষয় ছিল, সব ক্যামেরাম্যানের ফ্রেমে সামনে বসে থাকা অবগুন্ঠনবতী ফতিমার চেহারাটাই বেশি করে এসেছিল। এখনও যদি কোনও বিদেশি সংবাদপত্র কিংবা বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল ভারতবর্ষের তিন তালাক বিরোধি আন্দোলন নিয়ে কোন খবর করে, তাহলে যন্তরমন্তরে বসে থাকা আমার চেনা সেই মেয়েটির ছবিই ব্যবহার করে। দিল্লির এক বস্তি থেকে উঠে আসা, অন্তসত্ত্বা এক মুসলিম মহিলার ছবি ‘আইকনিক’ হয়ে উঠেছে দেশ বিদেশের মিডিয়ার কাছে। আসলে তো ফতিমাদের মতো মেয়েদের প্রতিবাদটাই ‘আইকনিক’। ওরাই তো হারিয়ে দিল এতদিন আমাদের উপর চেপে বসে থাকা জগদ্দল পাহাড়টাকে।

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে মঙ্গলবার থেকে দেশে তিন তালাক প্রথা বাতিল। স্বভাবতই সকলে খুশি। আমি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আজ থেকে আরও বড় লড়াই শুরু হল। যেসব মুসলিম মহিলারা এতদিন তিন তালাকের শিকার হতেন, এবার থেকে তাঁদের আইনি রক্ষা কবচের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। মুর্শিদাবাদ থেকে মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও, মুসলিম মহিলাদের জন্যে এই আইনি ব্যবস্থাটা তৈরি করা আমাদের কাছে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যখন আমরা সুপ্রিম কোর্ট-এ জিততে পেরেছি, তখন এই কাজেও পিছু হটবো না। মুসলিম মহিলাদের সমানাধিকারের আন্দোলনকে আরও কয়েকধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াইটা আজ থেকে শুরু হল। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, ‘দিস ইজ জাস্ট দ্য বিগিনিং, নট দি এন্ড’।

এরপরে আমরা মুসলিম মহিলাদের সমান সম্পত্তির সমানাধিকার নিয়ে রাস্তায় নামতে শুরু করব। যাঁরা এতদিন আমাদের বিরোধিতা করে এসেছেন, তাঁরা হয়ত জানেন না মুসলিম পার্সোনাল ল অনুযায়ী একজন মুসলিম মহিলাকে সম্পত্তির ঠিক কতটুকু অংশ দেওয়া হয়! যদি আফ্রিকার তিউনিশিয়ার মতো মুসলিম প্রধান দেশে সেদশের রাষ্ট্রপতি আইন করে মুসলিম মহিলাদের সম্পত্তির সমানাধিকার সুনিশ্চিত করার কথা ভাবেন, তবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কেন পিছিয়ে থাকবে? আসলে আমি এটা জানি এদেশে ‘মুসলিম কট্টরপন্থা’র বিরুদ্ধে মুখ খোলাটা যথেষ্ট ‘প্রগতিশীল’ নয়! আমি বা আমার মতো আরও অনেক মুসলিম মহিলা অবশ্য সেই ‘প্রগতিশীলতা’কে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে রাজি নই, যা দেশের ১০ কোটি মুসলিম মহিলাকে সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

মুসলিম মহিলারাই আদালতে গিয়ে হাজি আলি দরগায় ঢোকার অধিকার আদায় করে এনেছিল, আজ তাঁদেরই লড়াই সুপ্রিম কোর্টে সাংবিধানিক বেঞ্চের কাছে তিন তালাককে বাতিল বলে ঘোষণা করিয়ে দিল্। তাহলে বাকি অধিকারগুলোও এবার আমরা কেন আদায় করে নেব না?