ঠিক কোন যুক্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র মুসলমান-বিরোধী?

‘ফকির বলিল, বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারের বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দুরাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে। সেই একজনই হিন্দু মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহাকে হিন্দু করিয়াছেন, তিনিই করিয়াছেন, যাহাকে মুসলমান করিয়াছেন, সেও তিনিই করিয়াছেন। উভয়েই তাঁহার সন্তান; উভয়েই তোমার প্রজা হইবে। অতএব দেশাচারের বশীভূত হইয়া প্রভেদ করিও না। প্রজায় প্রজায় প্রভেদ পাপ। পাপের রাজ্য থাকে না।”

জীবনের শেষ উপন্যাস ‘সীতারাম’-এ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মুসলমান ফকির চাঁদশাহের মুখ দিয়ে সীতারামের উদ্দেশ্যে যে কথাগুলি বলেছিলেন, তা কি আমরা মন দিয়ে পড়েছি? যদি পড়ে থাকি, তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে কোন যুক্তিতে বলব তিনি মুসলমান বিরোধী ছিলেন? এবং বন্দেমাতরমের স্রষ্টাকে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তিতে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যায় কলঙ্কিত করে রাখব? বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৮০ তম জন্মবার্ষিকীতে বোধহয় আমরা যাঁরা ইতিহাসের ছাত্র-ছাত্রী, তাঁদের কাছে এটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। এবং বাঙালির নবজাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ এবং আধুনিক ভারতের সাহিত্যচর্চার অন্যতম পথীকৃত, নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার এই খনজন্মা মনীষীকে ভুলে থাকারও কোনও যুক্তি পাব না।

বঙ্কিমচন্দ্র, আনন্দমঠ এবং বন্দেমাতরম, যে তিনটি শব্দ প্রায় ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সমার্থক। সেগুলি নিয়ে কোনওরকম আলোচনা শুরু হলেই দেখি তথাকথিত প্রগতিশীল এবং ‘সেকুলার’-দের কেমন একটা অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। এবং একদল এটা বলতে নেমে পড়েন, ‘বন্দেমাতরম’-এ যেহেতু দেশকে ‘মা’ হিসাবে বন্দনা করা হয়েছে, সেহেতু এই গান মুসলমানরা জাতীয় সংগীত হিসাবে স্বীকার নাও করতে পারেন। এবং মুসলমানরা ‘বন্দেমাতরম’ গাইতে নাও চাইতে পারেন। কারণ দেশকে ‘মা’ হিসাবে বন্দনা করাটা নাকি ‘ইসলাম বিরোধী’! ইতিহাসের পড়ুয়া হিসাবে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলাম চর্চা সম্পর্কে সামান্য গবেষণার সূতে আমার বিনীত প্রশ্ন থাকে, ভারতবর্ষের ২০ কোটি মুসলমানের জন্য যদি ‘দেশমাতৃকা’র বন্দনা ‘ধর্মবিরোধী’ হয় এবং ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়াটা ‘ইসলাম বিরোধী’ হয়, তাহলে বাংলাদেশের ১৪ কোটি মুসলমান কোন যুক্তিতে ‘আমার সোনার বাংলা’কে আবেগবিহ্বল চিত্তে গাইতে পারে? জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহণ করতে পারে? রবীন্দ্রনাথের সেই গানেও তো দেশকে ‘মা’ রূপেই কল্পনা করা হয়েছে, সেই দেশমাতাকে ‘বন্দনা’ করা হয়েছে! শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সেই লাইনগুলি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “মা তোর বদনখানি মলিন হলে, আসি নয়নজলে ভাসি”…..।

তাহলে বাংলাদেশের ১৪ কোটি মুসলিম সজল চোখে দেশকে ‘মা’ হিসাবে স্মরণ করলে, দেশমাতৃকার বরণ করলে সেটা ‘ইসলাম বিরোধী’ হয় না, আর ভারতবর্ষে মুসলিমদের ‘বন্দেমাতরম’ গাইতে হলেই গেল গেল রব ওঠে? রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নিয়ে কারও প্রশ্ন তোলার সাহস হয় না। আর বঙ্কিমচন্দ্র ‘সাম্প্রদায়িক’?

‌    আসলে ভারতবর্ষে ‘বুদ্ধিজীবী’দের নির্মানে এবং যে কোনও ‘কাল্ট’ তৈরিতে বামপন্থীদের প্রভাব এত বেশি এবং বামমনস্কতা এত ‘প্রবল’, যে ‘স্টিরিওটাইপ’ এর সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রকে ঠিক ‘ছেঁটে’ নিতে পারেননি অনেকমহলই। এমনিতে প্রেসিডেন্সি কলেজের এই উজ্জ্বল, মেধাবী ছাত্র প্রতিভার বিচারে এতটাই গনগনে আগুন যে তাতে অনেক ‘মধ্যমেধা’রই হাত পুড়ে যায়। যাই তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখো, স্মরণ করো না এবং এইরকম একজন যশস্বী লেখকের গায়ে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা সেঁটে দাও। বঙ্কিম জীবনীকার অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য চমৎকার লিখেছেন, ‘আনন্দমঠের সন্ন্যাসীরা মুসলমান রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হলে আমরা বলি বঙ্কিম মুসলমান বিদ্বেষী ছিলেন, বঙ্কিম যখন উপন্যাসের শেষে মহাপুরুষের মুখ দিয়ে হিন্দু ধর্মের সুতীব্র সমালোচনা করে হিন্দু সন্তানদলের হাত থেকে রাজ্যশাসনের অধিকার কেড়ে নেন তখন আমরা তাঁকে হিন্দুবিদ্বেষী বলি না কেন? হিন্দুধর্মের ত্রুটি-বিচ্যুতি-দূর্বলতার সমালোচনা করলে যদি হিন্দু-বিদ্বেষী না হই তবে অত্যাচারী মুসলমান রাজশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করলেই বা সাম্প্রদায়িক আখ্যায় কলঙ্কিত হতে হবে কেন? আনন্দমঠের সন্ন্যাসীদের সব কাজ নিশ্চয় পছন্দ করেননি বঙ্কিমচন্দ্র। তা যদি করতেন তাহলে তাদের হাত থেকে দেশ শাসনের অধিকার তিনি কেড়ে নিতেন না। আনন্দমঠে বঙ্কিম সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহের চিত্র সবিস্তারে এঁকেছেন; এবং উপন্যাসের সমাপ্তিতে এসে তাঁর অসামান্য সত্যনিষ্ঠ নিরপেক্ষ বিচারশক্তির পরিচয় দিয়েছেন।’’

বঙ্কিম জীবনীকারের এই বিশ্লেষণ থেকে আবার সাহিত্যশ্রষ্ঠার নিজের লেখায় ফিরি। যে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ১২৮৭ সনের চৈত্রে ‘আনন্দমঠ” ছাপা শুরু হয়, সেই একই পত্রিকায় তার তিনমাস আগে, অর্থাৎ পৌষ সংখ্যায় ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’ শীষক প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, “লোকসংখ্যা গণনায় স্থির হইয়াছে যে যাহাদিগকে বাঙ্গালী বলা যায়, যাহারা বাঙ্গালাদেশে বাস করে, বাঙ্গালাভাষায় কথা কয়, তাহাদিগের মধ্যে অর্ধেক মুসলমান”। মনে রাখবেন, এর আগে এই একই পত্রিকায় ‘বঙ্গদর্শন’-এ ১২৭৯ সনে চারটে সংখ্যা জুড়ে ছাপা হয়েছিল তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘বঙ্গদেশের কৃষক’। এবং সেই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র একই সঙ্গে হাসিম শেখ এবং রামা কৈবর্ত্ত, অর্থাৎ বাংলার মুসলমান এবং হিন্দু প্রজা, কি দূর্দশার জীবন যাপন করছে, তার সুনিপুণ ছবি আঁকেন। বাংলার কৃষকের জীবন যাপনের এই ছবি ক্যানভাসে আঁকার সময় তিনি হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ তো করেনইনি, বরং বারেবারে ‘ছয় কোটি সুখী প্রজা’ দেখার কথা বলেছেন। তাঁর নিজের কথায়, “দুই চারিজন অতি ধনবান ব্যক্তির পরিবর্তে’ ‘ছয় কোটি সুখী প্রজা’ দেশের মঙ্গল এবং শ্রীবৃদ্ধিকে সূচিত করবে। এবং ‘বন্দেমাতরম’-এর স্রষ্টা স্পষ্ট করে বারবার বলেছেন, এই ছয় কোটি প্রজার মধ্যে তিন কোটি হাসিম শেখ আর তিন কোটি রামা কৈবর্ত্ত।

‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপসংহারে ‘গ্রন্থাকারের নিবেদন’-এ বঙ্কিমচন্দ্র যে কথা বলেছিলেন, আসলে সেটাই তাঁর জীবনের, সাহিত্যকীর্তির মূল মন্ত্র। তিনি লিখেছেন, “গ্রন্থকারের বিনীত নিবেদন এই যে, কোন পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু মুসলমানের কোন প্রকার তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। হিন্দু হইলেই ভাল হয় না, মুসলমান হইলেই মন্দ হয় না, অথবা হিন্দু হইলেই মন্দ হয় না, মুসলমান হইলেই ভাল হয় না। ভাল মন্দ উভয়ের মধ্যে আছে। বরং ইহাতে স্বীকার করিতে হয় যে, যখন মুসলমান এত শতাব্দী ভারতবর্ষের প্রভু ছিল, তখন রাজকীয় গুণে মুসলমান সমসাময়িক হিন্দুদিগের অপেক্ষা অবশ্য শ্রেষ্ঠ ছিল। কিন্তু ইহাও সত্য নহে যে, সকল মুসলমান রাজা সকল হিন্দু রাজা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন। অনেক স্থলে মুসলমানরাই হিন্দুর অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অনেক স্থলে হিন্দু রাজা মুসলমান অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণের সহিত যাহার ধর্ম আছে- হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, সেই শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণ থাকিতেও যাহার ধর্ম নাই- হিন্দু হউক, মুসলমান হউক- সেই নিকৃষ্ট।’

এই অসাধারণ স্পষ্টবাদীতা এবং যুক্তি বিশ্লেষণের জন্যই বঙ্কিমচন্দ্র সবসময় স্মরণীয় এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পথপ্রদর্শক। এবং প্রচলিত ‘হিন্দুত্ববাদ’-এর স্টিরিওটাইপ-এ ফেলে তাঁকে মাপতে যাওয়াটা যতটাই মুর্খামি, ততটাই অমার্জনীয় অপরাধ ‘দুর্গেশনন্দিনী’-র লেখককে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা দিয়ে দেওয়াটা। বাঙালির নবজাগরণ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ-এ বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকাকে বিশ্লেষণ করতে হবে একেবারে নির্মোহভাবে এবং সেইসময়ের বাস্তবতাকে স্মরণে রেখে। উনবিংশ শতাব্দীর সেই বাস্তবতাকে অনুসরণ করে যদি আমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে বিশ্লেষণ করি এবং তাঁর লেখাকে অনুধাবন করি তাহলেই ‘আনন্দমঠ’-এর গুরুত্ব নির্ধারণে আমরা কোনও ভুল করব না। একথা সত্যি যে ‘আনন্দমঠ’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ যখন প্রকাশিত হচ্ছে, তখন তাতে বঙ্কিমচন্দ্র অনেক পরিমার্জনা করেছেন। অনেক জায়গাতে ইংরেজ সেনার পরিবর্তে ‘যবনসেনা’ এসেছে, কিন্তু তাতে ‘বঙ্গদর্শন’এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘আনন্দমঠ’-এর মূল সুরটি হারিয়ে যায়নি। ব্রিটিশ শাসকের বিরোধিতায় রাজকর্মচারী, বলা ভালো ‘উচ্চপদস্থ’ রাজকর্মকারী ‘বাবু’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হয়তো ‘কৌশলী’ হয়েছেন, কিন্তু শাসকের অত্যাচার, অনাচারের বিরোধিতায় ‘প্রজা’র কি করা উচিত, সেই কথা কিন্তু ‘আনন্দমঠ’-এর প্রতিটি পরিচ্ছেদ থেকে কখনো হারিয়ে যায়নি।

নজরুলকে বিচার করতে গেলে যেমন ‘মুসলমানের কবি’ ভাবাটা শুধু অতিসরলীকরণ নয়, ‘দুখু মিঞা’র প্রতিভাকে আসলে অপমান করা, তেমনই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী’ আখ্যা দেওয়াটা আসলে ইতিহাসের অপব্যাখ্যা। সদ্য প্রয়াত হয়ে যাওয়াম বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে ‘রাইজিং কাশ্মীর’ এর ‘প্রাক্তন’ সম্পাদক সৈয়দ সুজাত বুখারি নিজের ফেসবুক পোষ্ট-এ একটা কথা চমৎকার লিখেছিলেন। ঠিক যেদিন বব ডিলান গান লেখার জন্য নোবেল সাহিত্য পুরষ্কার পেলেন, সেদিন সুজাত তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছিলেন, “ভাগ্যিস বব ডিলান-কে কেউ ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেয়নি”। সুজাত যেমন ডিলান, ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে লেখা তাঁর গানকে টেনে এনে দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের সমসাময়িকতাকে এবং সংজ্ঞাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন, তেমনই বঙ্কিমচন্দ্রের মতো খনজন্মা সাহিত্য প্রতিভাকেও বিচার করতে হবে সেই সময়ের প্রেক্ষিতে এবং তাঁর সাহিত্যের সামগ্রিকতাকে ধরে। তাহলেই আমরা বুঝতে পারব বঙ্কিমচন্দ্র এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু দীনবন্ধু মিত্র, যিনি ‘নীলদর্পণ’ লিখে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন, কিভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নির্মানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।