‘খ্রিষ্টান’ মেঘালয়, নাগাল্যান্ডে সরকার গঠন বলে দিল বিজেপি আর অচ্ছ্যুৎ নয়

সোনিয়ার কংগ্রেস যে সংখ্যালঘুদের সমর্থন পেত, তা এখন মোদীও পাচ্ছেন।

ত্রিপুরা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে উচ্ছাসের কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অন্য দুটি রাজ্যের ফল বিশ্লেষণ খুব একটা হচ্ছে না। একথা ঠিক বামেদের দুর্গ বলে পরিচিত ত্রিপুরার জয় বিজেপির নির্বাচনী ইতিহাসে বড় মাইলফলক, কিন্তু নাগাল্যান্ড, মেঘালয়ের ফলাফলও দেখিয়ে দিয়েছে খ্রিষ্টান অধ্যুসিত রাজ্যেও বিজেপি এবং তার সহযোগী দলরা সরকার গঠন করতে পারে। নাগাল্যান্ডে খ্রিষ্টানরাই ৯৮ শতাংশ, আর মেঘালয়ে খ্রীষ্টানরা ৮৩ শতাংশ।

অতএব বিজেপিকে আর শুধু ‘হিন্দু’দের পার্টি বা সংখ্যালঘুরা বিজেপিকে অচ্ছুত বলে মনে করে, একথা আর বলা যাবে না। বিশেষ করে নাগাল্যান্ডের যেখানে অনেক সংবাদ মাধ্যমই খবর করেছিল, বেশ কিছু গির্জার সংগঠন থেকে সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ডাক উঠেছিল। সংবাদমাধ্যমের হেড লাইনই ছিল, কিছু গির্জার সংগঠন নাকি ‘ফতোয়া’ দিয়ে বলছে ‘হয় ক্রশকে বাছো, না হলে ত্রিশুলকে বাছো।

৯৮ শতাংশ খ্রিষ্টান মানুষের যেখানে বাস, সেই নাগাল্যান্ড বিজেপি এবং তার সহযোগী দলকে ক্ষমতায় এনে দেখিয়ে দিয়েছে, কোন ধর্ম প্রতিষ্ঠানের কোন ‘ফতোয়া’কেই সাধারণ ভোটাররা মেনে নেন না। নাগাল্যান্ডের উদাহরণটা মাথায় রাখলে এরপর থেকে ভারতের কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের তরফেই হয়তো ভোট নিয়ে ফতোয়া দেওয়া বন্ধ হবে। ধর্মগুরুদের স্থান যে শুধুমাত্র ধর্ম আচরণের ক্ষেত্রে, মানুষের ‘ব্যক্তিগত’ পরিষদ ছেড়ে ধর্ম যেন সংবিধান বা রাজনীতি, কোনটাকেই গ্রাস না করে নেয়, সেদিকে বোধহয় সকলেরই নজর রাখার সময় এসেছে।

এর আগে খ্রীষ্টান অধ্যুসিত গোয়াতে সরকার গড়েছে বিজেপি। কিন্তু উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এমন দুই রাজ্যে বিজেপি এবার অন্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কুর্সিতে বসছে, যেখানে জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই খ্রিষ্টান। সহজেই অনুমান করে নেওয়া যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা আরএসএস থেকে বিজেপিতে আসা, দলের হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বে থাকা রাম মাধব সরকার এবং প্রশাসনকে শুধুমাত্র ‘গোমাংস’ কেন্দ্রীক বিতর্কের মধ্যে আটকে রাখতে চাইছেন না।

সম্ভবত এই কারণেই তিন রাজ্যের বিধানসভার ফল বেরোনোর ঠিক আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জর্ডনের রাজার সম্মানে আয়োজিত এক আলোচনাচক্রে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, তিনি এবং তাঁর সরকার ভারতবর্ষের ‘বহুত্ববাদ’-এ বিশ্বাস করে। ওই আলোচনাসভায় দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী যেভাবে ভারতবর্ষের ইসলামীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেছেন, তা হয়ত অনেকেরই ভুরু কুঁচকে দিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এবং সরকারের প্রধান হিসাবে তিনি কোন নীতি নিয়ে চলতে চান, এবং ভারতীয় সমাজ এবং রাজনীতিকে তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোন জায়গা দিতে চান তার পরিষ্কার ইঙ্গিত ছিল।

মোদীর বক্তৃতার পরপরই উত্তরপূর্বের দুই ‘খ্রীষ্টান’ রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠন বলে দিচ্ছে, পদ্মফুলকে আর সংখ্যালঘুরাও ‘অচ্ছ্বুত’ বলে মনে করে না। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একের পর এক রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠন বলে দিচ্ছে, পদ্মফুলকে আর শুধু পশ্চিমভারত বা হিন্দি বলয়ের প্রতীক বলে কেউ মনে করছে না।

সোনিয়া গান্ধী যখন কংগ্রেসের সভানেত্রী ছিলেন, তখন কংগ্রেসের ভিতরে এবং বাইরে একটা চালু রসিকতা ছিল, ১০ নং জনপথ বাসিনী যেহেতু রোমান ক্যাথলিক সেহেতু দলে যাঁরা রোমান ক্যাথলিক, তাঁদের ‘উন্নতি’ অবধারিত। নিন্দুকেরা উদাহরণ হিসাবে  সোনিয়ার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সচিব ভিনসেন্ট জর্জ, কেরালা থেকে উঠে আসা এ কে অ্যন্টনি বা কর্নাটকের নেতা অস্কার ফার্নান্ডেজের ‘উল্কা’ সদৃশ উত্থানের উদাহরণ দিতেন। সোনিয়া এবং তাঁর ঘনিষ্ট বৃত্তে থাকা ‘খ্রীষ্টান’ নেতাদের নিয়ে যাবতীয় জল্পনা-আলোচনায় ছেদ পড়েছিল পূর্ণ সাংমার বিদ্রোহে।

পূর্ণ অ্যজিটক সাংমা। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই আদিবাসী এবং খ্রিষ্টান নেতা শারদ পাওয়ারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। সাংমাদের যুক্তি ছিল, ‘বিদেশীনি’ কেউ ভারতের কুর্শিতে বসতে পারেন না। তার ফল হয়েছিল নিদারুন। সাংমা, শরদ পাওয়ারদের কংগ্রেস বহিষ্কার করেছিল। পরবর্তীকালে শরদ পাওয়ার যখন কংগ্রেসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন, তখন সাংমা জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের হয়ে জিতে লোকসভায় গিয়েছেন।

সেই পূর্ণ সাংমা যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এবং দিল্লিতে সবার কাছে গিয়ে বলেছেন একজন আদিবাসী দেশের রাষ্ট্রপতি হলে পরে ভারতবর্ষের বিশাল সংখ্যক আদিবাসী মনের জোর পাবেন এবং তাঁদের উন্নতিও তরান্বিত হবে, তখনও কেউ পূর্ণ সাংমার কথা শোনেননি। বিজেপি সমর্থন করলেও পূর্ণ সাংমা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। ইতিহাসের কি নিদারুন পরিহাস দেখুন, সেই পূর্ণ সাংমার ছেলে কংগ্রেসকে হটিয়ে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসছেন বিজেপির সমর্থন নিয়ে। আর ঠিক সেই সময় সোনিয়া পুত্র রাহুল গান্ধী ইতালিতে ছুটি কাটাচ্ছেন।

ত্রিপুরা যেমন জানিয়ে দিয়েছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি আর বিজেপিকে ভোট দিতে দ্বিধা করে না, তেমনই মেঘালয় এবং নাগাল্যান্ড জানিয়ে দিল, খ্রিষ্টান অধ্যুসিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিও নরেন্দ্র মোদীকে ‘হিন্দুত্ববাদী’ নেতা বলে মনে করে না।