করোনা ও আয়ুর্বেদ

আজ এই বিষয়ে আলোকপাত করা যাক  –

বর্তমান বিশ্ব ভয়ঙ্কর উৎকন্ঠা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।নভেল করোনা গ্রাস করেছে মানুষের সহজ জীবন।  আমাদের সনাতন ধর্মের পুরাণ উপনিষদ কিংবা বেদে কি এই ধরণের সংক্রমণের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও আলোচনা আছে? 

আজ এই বিষয়ে আলোকপাত করা যাক  –

চারটি বেদের মধ্যে অথর্ব বেদে চিকিৎসা সংক্রান্ত আলোচনা আছে। মূলত ভেষজ আয়ুর্বেদই ছিলো চিকিৎসার মাধ্যম। সম্ভাব্য সাড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে বেদগুলি রচিত হয়। মন্দির গুলো ছিল আয়ুর্বেদ চর্চার পীঠস্থান। এই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে কি  করোনা, রুবেলা, স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে কিছু বলা আছে? আসলে এই নামগুলি আধুনিক বিজ্ঞানের দেওয়া, বেদ যেহেতু দেবনাগরী ভাষায় রচিত তাই এই লক্ষণযুক্ত রোগের নাম অন্য শব্দে ছিল। ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া নাম ঋষিরা দিয়েছিলেন দৃশ্য ও অদৃশ্য কৃমি ইত্যাদি।

তাঁরা কি মহামারী সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন? অবশ্যই বলেছিলেন। এর নাম খুবই বিবেচনা করে দিয়েছিলেন ‘জনপদ ধ্বংস’। শাস্ত্রের একটি অধ্যায় আছে জনপদ ধ্বংস নামে। চরক সংহিতায় আছে মহামারীর কারণ চারটি-জল, বায়ু, দেশ, কালের দূষণ। এদের মধ্যে কালের দূষণ যে ভয়ঙ্কর তা বলা আছে। কাল দূষণ হলে অপেক্ষা করতে হবে আগামীর জন্য, কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয় এই সময়। আর এই মহামারী করোনা কাল দূষণের ফল। কাল দূষণের ফলে যে জনপদ ধ্বংস(মহামারী) হয়, তা প্রধাণত অধর্মের ফল। অধর্ম কেন হয়? প্রজ্ঞাপরাধের কারণেই অধর্ম হয়। প্রজ্ঞার অধীনে থাকা ধী, ধৃতি, স্থিতি এই তিনটির সঠিক উপযোগ না হলে প্রজ্ঞাপরাধ দেখা দেয়। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক – আমরা জানি বেশি তেলমশলা খাবার শরীরের পক্ষে ভালো না, তবু খাই। জানি গাছ আমাদের প্রাণ, তবু গাছ কাটলে পরিবর্তে আর একটা গাছ লাগাই না.. ইত্যাদি। এই যে জেনেও জ্ঞানপাপীর মতো আচরণ করি এটিই প্রজ্ঞাপরাধ।

বর্তমান সমাজ কিভাবে প্রজ্ঞাপরাধ করে চলেছে তার উদাহরণ ব্যাপক। যথেচ্ছ গাছ কাটা, যানবাহনের বাড়বাড়ন্ত, কলকারখানা দ্বারা নদী দূষণ, পরমাণু বোমা পরীক্ষা নিরীক্ষা ইত্যাদি। .. প্রকৃতি কি সব মেনে নেবে? এই অপরাধ প্রতিকারের তিনটি উপায় আছে, তা হল – ১)রসায়ন সেবন ২)পঞ্চকর্ম চিকিৎসা ৩)সৎ বৃত্ত পালন।

১)রসায়ন সেবন: যে ভেষজ গ্রহণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, জরাকে প্রতিরোধ করা যায় তাই রসায়ন সেবন। এর আবার তিনটি ভাগ- ক) নৈমিত্তিক রসায়ন: বিভিন্ন ব্যাধি হলে যে ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করা হয়। জ্বর, কুষ্ঠ, শ্বাসকষ্ট প্রভৃতি রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত রসায়ন। খ) কাম্য রসায়ন: কিছু কাম্য করে ব্যবহৃত ভেষজ। যেমন সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করার জন্য কাঁচা হলুদ, খাওয়া হয়। গ) আজস্মিক রসায়ন: জেনে বা না জেনে আমরা প্রতিনিয়ত যে রসায়ন সেবন করে চলেছি। যেমন:দুধ, মধু, ঘী, তুলসী, বাসব পাতা ইত্যাদি ব্যবহার করি। এগুলো শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে আমাদের রক্ষা করে। 

২)পঞ্চকর্ম চিকিৎসা: পাঁচ ধরণের চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। পদ্ধতি গুলি হল – 

*বমন: বমন করিয়ে চিকিৎসা 

*রেচন:দেহের দূষিত পদার্থ বহিষ্কৃত করে চিকিৎসা 

*বস্তি:দুধরণের বস্তির মাধ্যমে চিকিৎসা। পায়ুদ্বারের মধ্যে ওষুধ প্রয়োগের চিকিৎসা। 

*নস্যকর্ম: নাকের মাধ্যমে দূষিত পদার্থ বের করে দেওয়া। 

৩)সৎ বৃত্তিপালন : হলো সঠিক কাজ। হিংসা, লোভ না করা, নিষ্ঠুর না হওয়া, অভুক্তকে অন্ন দান করা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে শারীরিক মানসিক, সামাজিক কল্যাণ মূলক কাজ করা যায়।

শাস্ত্রের মূল মন্ত্র :সুস্থ ব্যক্তির স্বাস্থ্য রক্ষাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তারপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে যিনি অসুস্থ হয়েছেন। ভারত সরকারের আয়ষ্মন্ত্রক থেকে সংসমানি বটি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।যা গুলঞ্চ, শুঁটপিপুল, মুথা, চিরতা, কালমেঘ প্রভৃতি দ্বারা তৈরি। এছাড়া গুলঞ্চ চূর্ণ দিনে তিন চার মাত্রা খাওয়া, চিরতা ভিজিয়ে তার জল সেবন, তুলসী পাতা – গোলমরিচ-মধু মিশিয়ে রোজ সকালে সেবন করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। 

এবারে আসা যাক আইসোলেশন, কোয়ারান্টাইন, সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং এর কথায়। প্রাচীন ভারতে রোগ জীবাণুর ধ্বংস লীলার প্রতিরোধে এই দাওয়াইয়ের প্রয়োগ হতো। মহামারী ঠেকাতে রোগীকে পরিবার সমেত অন্তরিন করে আলাদা রাখার কথা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে। চরক ও সুশ্রুতসংহিতা অবলম্বনে লেখা ‘অষ্টাঙ্গ হৃদয়’ এ মহামারী রোধে একুশ দিন লকডাউনের কথা বলা হয়েছে।জীবাণুতে যখন সভ্যতা বিপন্ন, তখন প্রতিটি রোগী ও তার সংস্পর্শে আসা মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। যা আজ সারা বিশ্ব অনুসরণ করছে। “একবিংশোতিরাত্রেন বিষং শ্যাম্যতি সর্বথা”। অর্থাৎ একুশতম রাতে বিষের উপশম হয়। 

সুশ্রুতসংহিতাতে আক্রান্তের বাড়ি, শয্যা, আসন, অলংকার ও ব্যবহার্য জিনিস ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। সুশ্রতসংহিতার ছয় নম্বর অধ্যায়ের ৩২ এবং ৩৩ নম্বর শ্লোকে জনপদ ধ্বংসের উপসর্গ হিসেবে কাশি, বমি, নাক দিয়ে জল পড়া ইত্যাদির উল্লেখ আছে। এটি সংক্রমিত হয় স্পর্শের মাধ্যমে, কাশির মাধ্যমে, একই থালায় ভোজন, একই বিছানায় শয়নের মাধ্যমে।   “উপসর্গিক রোগশ্চ সংক্রমন্তি নরানরং” । আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে কতো উন্নত ছিল এই চিকিৎসা ব্যবস্থা। ক্রমে বহিরাগত আক্রমণে, পাশ্চাত্য অনুকরণের দাসত্ব মানসিকতা প্রভৃতি কারণে আয়ুর্বেদের এই ঐতিহ্য বিনষ্ট হয়েছে।পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আয়ুর্বেদ পরিষদের সভাপতি ডঃ প্রদ্যোৎ বিকাশ করমহাপাত্র বলেছেন চরক ও সুশ্রুতসংহিতা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হতো ।অগণিত শিক্ষার্থীর হাত ধরে এই সমস্ত গ্রন্থের প্রতিলিপি চীন তিব্বত ও অন্যান্য পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই তো ঐ সমস্ত দেশগুলিতে ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের এতো প্রভাব ।

আজ WHO কিংবা ভারত সরকার যা যা ব্যবস্থা এই করোনা প্রতিরোধে নিয়েছে, তা কিন্তু শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। সুস্থ মানুষের রক্ষার্থে অসুস্থ মানুষকে অন্যত্র সরানো। শাস্ত্রে আরো নিখুঁত আলোচনা করা আছে। যাইহোক, আমরা যদি আমাদের বেদগুলিকে গুরুত্ব সহকারে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারতাম, অনুশীলন করতে পারতাম, তাহলে কোনও জনপদধ্বংসের সম্ভাবনাই থাকতো না। আধুনিক শিক্ষার নামে আমরা আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও চিকিৎসা পরম্পরা ধরে রাখার চেষ্টা করিনি।আজ সময় এসেছে আবার সেই গৌরব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার।  যে লকডাউন চলছে তাকে গুরুত্ব দিয়ে পালন করা জরুরি। ধীরে ধীরে পৃথিবীর এই অদ্ভুত আঁধার কেটে আবার আলো ফিরে আসবে ভগবানের কাছে এই কামনা করি।

সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ
    সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ
    সর্বে ভদ্রাণী পশ্যন্তু
    মা কশ্চিদ্ দুঃখ ভাগ্ ভবেৎ