করোনার যুদ্ধে আত্মঘাতী বাংলা – জীবন নিয়ে রাজনীতি আর কত দিন?

গত ১.০৪.২০২০ তারিখ চিকিৎসক ডাঃধীমান গঙ্গোপাধ্যায় বিকেল ৪.২০মি সময়ে নবান্ন সাংবাদিক সম্মেলন করে Covid19 পজেটিভ কেস বলেন মোট ৫৩,  মৃত্যু সংখ্যা মোট ৭। মূখ্য সচিব  রাজীব সিনহা সন্ধ্যে ৬ টায় নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন Covid19 পজেটিভ কেস ৩৪, মৃত্যু সংখ্যা ৩। উল্লেখ্য মোট মৃত্যু ৭ জনের মধ্যে ৪ মৃত্যুর কোন খবর নেই। ফলে নবান্ন এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্ত শুরু হয়। এরপর মাননীয়া মূখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে যে বক্তব্য দেন তাতে বিভ্রান্ত সচেতন পূর্বক কিনা এই নিয়ে সন্দেহের দানা বাঁধে। মাননীয়া বলেন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য বলেন ” কোন কেস কি কেস চিকিৎসকরা বুঝবেন,  আশা করি ইন্টারফেয়ার করার টাইম নয়, যেটা আপনারা সারা বছর করে থাকেন।  এই কেস স্বাস্থ্য ভবনের উপর ছেড়ে দিন। ..  দয়া করে প্রচার করবেন না।” প্রশ্ন হল কি প্রচার হবে না? করোনা পরিসংখ্যান। আর ইন্টারফেয়ার করবেন না?মানে পরিসংখ্যা জানার অধিকার নেই? আগে করে থাকে মানে? মাননীয়া মনে রাখুন আপনি ডাক্তার নন আর করোনা ডেঙ্গু নয়। করোনা সংক্রামক রোগ। অতীতের ডেঙ্গু ভাবলে ভুল হবে। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের বুলেটিনে ৩১ শে মার্চ পর্যন্ত গৃহ পর্যবেক্ষণের সংখ্যা ছিল এক লক্ষ কিন্তু গত ১ লা এপ্রিলে সেই বুলেটিনে গৃহ পর্যবেক্ষণের সংখ্যা ৯০ হাজার দেখানো হয় এবং এর পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের দৈনিক বুলেটিন বন্ধ হয়ে যায় । কিন্তু কেন হল বন্ধ ? ফলে সন্দেহের অবকাশ ফুটে ওঠে।  NICED (National Institute of Cholera and Enteric Diseases) পূর্ব ক্ষেত্রের অধিকর্তা ডা.  শান্তা দত্ত বলেন পশ্চিমবঙ্গে টেস্টিং কিটের অভাব নেই।  পরিসংখ্যান দিয়ে বলেন ২৭৫০০ কিট আছে।  পশ্চিমবঙ্গ এত জনগনঘনত্ব বেশী যে বেশী টেস্ট বেশী সংখ্যায় হওয়াটা খুব জরুরী। নমুনা পরিসংখ্যান যা আসছিল ৮০-৯০, এখন তা গত ৩/৪ তারিখের পর থেকে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়ে ১৮-২০। রাজ্য মেডিক্যাল গুলি NICED তে টেস্ট করার জন্য রোগী পাঠাচ্ছে না।  কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের করোনা হাসপাতালে ২০৪ নং বেডের ৪৩ বছরের সুদীপ্তা মুখার্জি জ্বর শ্বাস কষ্ট গলা ব্যথা নিয়ে ভর্তি হলে মারা যান কিন্তু উল্লেখ্য করোনা টেস্ট করা হয় নি মৃত মহিলার। যেকোন হাসপাতালে ইমার্জেন্সিতে কোন Covid19 টেস্ট করা হচ্ছে না।  এমনকি কোন রোগীর মৃত্যু হলে উপস্থিত ডাক্তারকে ডেথ সার্টিফিকেট দিতে হলে বিশেষ কমিটির কাছে অনুমতি নিতে হচ্ছে।  ফলে স্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তরে পর্যাপ্ত কিট থাকা সত্ত্বেও টেস্টিং হচ্ছে না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে  পরিসংখ্যান কম দেখানো হচ্ছে । যে এলাকা থেকে রোগীরা আসছেন সেখানেও টেস্টের ব্যবস্থা নেই।  মেচিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার প্রফেসর  ব্রার্মার মুখার্জি বায়ো পরিসংখ্যান তত্ত্ব দিয়ে বলেন ভারতবর্ষ যেখানে জনসংখ্যা 130কোটি+ সেখানে সামাজিক দূরত্ব যেমন দরকার তেমনি দরকার করোনা পজেটিভ কেসের সঠিক পরিসংখ্যান। এই টেস্ট ও কেসের উপর ভিত্তি করেই বিশেষজ্ঞরা Covid19 সংক্রান্ত লড়াই করার রণনীতি নির্ধারণ করবেন এবং রাষ্ট্র কাঠামোতে এই পরিসংখ্যানের উপর নির্ভর করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাই টেস্টের পরিসংখ্যান ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে সেই টেস্টের পরিসংখ্যান খুব কম। আগামীদিনে করোনা ভারতবর্ষের অর্থনীতিতেও বিরাট প্রভাব ফেলবে বলে প্রফেসর মুখার্জি আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। তাই লকডাউন সামাজিক দূরত্ব এবং টেস্ট পরিসংখ্যান বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের জন্য অপরিহার্য। গত ১০ এপ্রিল মূখ্য সচিব বলেন পশ্চিমবঙ্গে এখনও পর্যন্ত সর্বমোট টেস্ট হয়েছে ২০৯৫। পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যা মোট প্রায় ১০ কোটি ফলে প্রতি লাখে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার সংখ্যা মাত্র ২১। উল্লেখ্য অন্যান্য জনঘনত্ব বেশী এমন রাজ্যের তুলনায় খুব কম। স্পষ্ট পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তরের ভূমিকা বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন।  করোনাকে হারানোর জন্য যেমন লকডাউন জরুরী তেমনি করোনা লড়াইতে টেস্টিং টেস্টিং এন্ড মোর টেস্টিং ভীষণ জরুরী এবং এটাই শেষ পর্যন্ত একমাত্র রাস্তা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই। 

উত্তরবঙ্গ কালিংপঙে যে করোনা রোগীর মৃত্যু হয় সেই পরিবারের ছোট পুত্র বধূ বলেন হাসপাতালে কোন টেস্ট করা হচ্ছে না। কুকুরের মতন ব্যবহার করা হচ্ছে। ইতি মধ্যেই বেলেঘাটা আই. ডি,  হাওড়া জেলা হাসপাতাল,  উলুবেড়িয়া ইএসআই সহ উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে পর্যাপ্ত মাস্ক গ্লাভস সেনিটাইজার নেই। এই উত্তর বঙ্গের মেডিক্যাল কলেজে দিল্লীর নিজামুউদ্দিন তাবলিগী জামাত মারকাস থেকে ফেরত নকশাল বাড়ির এক ব্যক্তির লালারস পরীক্ষা হয় নি অথচ হাসপাতাল থেকে সে পলাতক। প্রশাসন এই জামাতিদের সন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদাসীন । অথচ গোটা দেশ ৩০% করোনা সংক্রমণ মারকাস থেকে হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় কোথাও সরকার স্যানিটাইজ করছে না। পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালে হাসপাতালে ডাক্তার নার্স ওয়ার্ড স্টাফরা বিদ্রোহ করার খবর উঠে আসছে রোজ । ইতি মধ্যে নীলরতন হাসপাতাল,  আর জি কর  মেডিক্যাল,  মেদিনীপুরের এক নার্সিংহোমে সংক্রমণের কারণে বেশ বড় সংখ্যায় প্রায় শতাধিক  স্বাস্থ্য কর্মীদের গৃহ পর্যবেক্ষণে পাঠানো হয়েছে।  রাজ্য সরকারের গাফিলতি ও সঠিক ভাবে টেস্ট না করার কারণে অচিরেই হাসপাতাল গুলির কর্মীরা গৃহ পর্যবেক্ষণে পাঠানোর ঘটনায় হাসপাতাল ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা ক্রমে ক্রমেই বাড়ছে। বিশিষ্ট ক্যান্সার চিকিৎসক ডাঃ ইন্দ্রনীল খান  রাজ্যসরকার কিট PPE বদলে রেইন কোর্ট দেওয়ার বিরোধিতা করলে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ ডাঃ খানকে গ্রেফতার করে। পরে অবশ্য জামিন পান। ফলে সবটাই স্পষ্ট রাজ্য সরকার করোনা সংক্রমণের লড়াই নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ তথা ভারতবর্ষের সঙ্গে লুকোচুরি করছেন যা আগামী দিনে বিপদ আরও কম হবে না বলে ধরাই যায় ।

হাওড়ার শিবপুরে ৩রা এপ্রিল রাতের অন্ধকারে পুলিশের কড়া পাহাড়াতে PPE পোশাকে আবৃত কিছু কর্মী এক মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে গিয়ে কবর দেয়।  পরের দিন ৪ঠা এপ্রিল পুরো এলাকা সেনিটাইজ করা হয়। এলাকার বাসিন্দারা এই বিষয়ে উদ্বিগ্ন। ১২ই এপ্রিল বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ দুই ব্যক্তি প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট জ্বর নিয়ে ভর্তি হলে এক ৬৫ বছরের বৃদ্ধ মারা যায়। মৃতের লালারস পরীক্ষা করা হয় নি। এবং মৃত্যুর কারণ গোপন করে মৃত দেহ পরিবারের হাতে না দিয়ে শশ্মানে নিয়ে যাওয়া হয়। ১২ই এপ্রিল হুগলির এঙগাসের গির্জা পাড়ার এক বৃদ্ধ দমদমের এক নার্সিংহোমে জ্বর কাশি গলা ব্যথা নিয়ে ভর্তি হন। কিন্তু লালারসের রিপোর্ট আসার আগেই ছেড়ে দিলে  মারা যান। এরপর ১৪ই এপ্রিল ভদ্রেশ্বর বাবু ঘাট শশ্মানে পুলিশের উপস্থিতিতে দাহ করা হয়। পরে প্রশাসন শশ্মানে কে বন্ধ করে সকল কর্মীদের কোরেন্টাইনে পাঠানো হয়। এছাড়াও রাতের অন্ধকারে প্রশাসনের উপস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির রোগের সঠিক কারণ না জানিয়ে এমন কি বাড়ির মানুষকে অন্ধকারে রেখে ধাপা কিংবা আসানসোলে কত মৃত দেহকে দাহ করেছে সেই বিষয়ে সঠিক তথ্য রাজ্য প্রশাসন লুকিয়ে রাখছে। মধ্য কলকাতার মুক্তারাম স্ট্রিটের এক বৃদ্ধা মৃত্যুর দাহ কর্মের একদিন পর রিপোর্ট আসে মৃতা করোনা পজেটিভ ছিলেন।  এই ভাবে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তর পরিসংখ্যান লুকিয়ে পশ্চিমবঙ্গের করোনা সংক্রমণ কে আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। বিশেষ সমীক্ষাতে বলা হয়েছে একজন সংক্রামিত রোগী সর্বোচ্চ ৯৩ জনের মধ্যে সংক্রমণ ঘটাতে পারেন।  তাই Covid19 ভীষণ ভাবে সংক্রামক ব্যাধি এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে উপদেশ নিয়ে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের কাজ করা উচিত।  করোনা সংক্রমণ নিয়ে রাজনীতি করার সময় এখন নয়। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষকে মহামারীর হতে হস্তান্তর না করাটাই প্রধান কাজ। ১৮২০ সালের কলেরা মহামারীতে এশিয়া মহাদেশে প্রায় ১লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২০ করোনা সম্পর্কে তাই লকডাউন, অধিক নমুনা পরীক্ষা, সঠিক পরিসংখ্যান, বিশেষ সমীক্ষা পরিকল্পনাই উত্তরণের এক মাত্র পন্থা। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার যদি করোনা সংক্রমণের পরিসংখ্যাকে ধামা চাপা দিয়ে  রাখতে চান তাহলে আগামীদিনে হয়তো করোনা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষকে করোনা মহামারীর কড়া মাশুল গুনতে হবে কিন্তু ততদিনে হয়তো অনেক বিলম্ব হয় যাবে। পশ্চিমবঙ্গ শশ্মান ভূমিতে পরিণত হবে।