এসি রুমে সিপিএমের পার্টি কংগ্রেস, আর বীরভূমে মাথা ফাটছে রামচন্দ্র ডোমদের

তৃণমূলের বিরোধিতায় বিমান-সেলিমরা কতটা আন্তরিক: নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়ছে

প্রত্যেকের জন্য শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘর। হোটেল থেকে সম্মেলন যাওয়ার জন্যও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি। তেলেঙ্গানায় সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসের জন্য খরচ হচ্ছে মাত্র ৬ কোটি টাকা। পঞ্চায়েত নির্বাচনে যখন জেলায় জেলায় সিপিএমের কর্মীরা মার খাচ্ছেন, অনেকে বাড়িছাড়াও, তখন সেই বাস্তবতার থেকে কতটা দূরে পার্টি কংগ্রেসে ব্যস্ত সিপিএমের নেতারা?

কলকাতায় যেদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অসুস্থ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে দেখতে গেলেন, এবং সব খবরের কাগজে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্যের সঙ্গে তৃণমূল সুপ্রিমোর ছবি ছাপা হলো, ঠিক সেদিনই সকালে বীরভূমে আক্রান্ত এবং আহত হয়েছেন সিপিএমের প্রাক্তণ সাংসদ রামচন্দ্র ডোম। কোনও কাগজ যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মীরা ভট্টাচার্যের সাক্ষাতের ছবিটি ছাপার পাশাপাশি মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা রামচন্দ্র ডোমের ছবিটি ছাপতো, তাহলে জেলায় জেলায় আক্রান্ত সিপিএম কর্মীদের কাছে ঠিক কি বার্তা যেত?

সিপিএম নেতারা অবশ্য এইসব নিয়ে ভাবিত নন। পঞ্চায়েত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে কি হলো বা হলো না, মনে হয় না তাই নিয়ে সীতারাম ইয়েচুরি বা প্রকাশ কারাতের কোনও মাথাব্যাথা আছে। উত্তর কোরিয়া থেকে ভেনেজুয়েলা, আন্তর্জাতিক সব বিষয় নিয়ে ভীষণ চিন্তিত সিপিএমের তাত্ত্বিক নেতারা পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে আদৌ ভাবছেন কিনা, তাই বোঝা দায়।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার ৭ বছরের মধ্যে এই রাজ্যে সিপিএমের অবস্থা এমনই হয়েছে যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করতে দল একটা ৬ ঘন্টার বনধ ডেকেই দায় ঝেড়ে ফেলেছে। বামেদের ডাকা এই সিকি দিনের বনধ নিয়ে উপহাস করতে ছাড়েনি তৃণমূল থেকে শুরু করে বিজেপি, সব দলই। খোদ  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো এই নিয়ে বামেদের বিদ্রুপই করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় হুল ফোটানো সব পোস্ট, এরপরে তো সিপিএমকে ‘৩ ঘন্টার বনধ’ ডাকতে হবে, এই ধরনের কটাক্ষে যখন রাজনৈতিক মহল সরগরম, তখন সিপিএম নেতারা কিন্তু নির্বিকার। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মুখে যে দলের সাংসদ এবং পলিটব্যুরোর সদস্য প্যালেস্তাইনে চলে যান, সেই দল তাদের আন্তর্জাতিকতাবাদ ছেড়ে বীরভূম বর্ধমানের কথা কতটা ভাবছে, তাই নিয়ে সত্যি সংশয় জাগে। মাথায় রাখবেন, প্যালেস্তাইনে চলে যাওয়া মহম্মদ সেলিম শুধু পশ্চিমবঙ্গ থেকে পলিটব্যুরোয় সিপিএমের প্রতিনিধি নন, এই রাজ্য থেকে সিপিএমের যে দু’জন লোকসভার সদস্য আছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতমও বটে।

তাহলে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের ভবিষ্যৎ কি? শুধুই আন্তর্জাতিকতাবাদ? আর এরই মাঝে আমার জেলা বর্ধমানের গুসকরায় সিপিএমের পার্টি অফিস ভাড়া দিয়ে দেওয়া হবে অর্থনৈতিক সংকট মেটানোর জন্য? সিপিএমের নিচুতলার কর্মী এবং সমর্থকরা প্রবলভাব বিভ্রান্ত। শেষপর্যন্ত গুসকরায় সিপিএমের পার্টি অফিস আর ভাড়া দেওয়া হয়নি এই নিয়ে প্রবল হৈ চৈ শুরু হয়ে যাওয়ায়, কিন্তু সিপিএমের নিচুতলার কর্মী সমর্থকরা আর লালঝান্ডা ধরে রাস্তায় বেরোতে রাজি হবেন? নেতারা যখন তেলেঙ্গানায় এসি ঘরে বসে তাত্ত্বিক আলোচনা করবেন, তখন শাসকদলের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে কেন সিপিএমের কর্মীরা পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য বুথে বসবেন?

আসলে দল হিসাবেই সিপিএম ঘোর সংকটে। এবং সেই সংকট যতটা ব্যবহারিক, ততটাই আদর্শগত দিক থেকেও। সীতারাম ইয়েচুরির তত্ত্ব দল মানুক কিংবা না মানুক, সিপিএম বুঝতে পারছে এই মুহুর্তে তাদের কাছে প্রধান শত্রু বিজেপি। ত্রিপুরায় মানিক সরকারের হেরে যাওয়ার পরে দলের মধ্যে এই নিয়ে কারোরই বিশেষ সংশয়ও নেই। যদি বিজেপিকে প্রধান শত্রু বলে মেনে নিতে হয়, তাহলে গোটা দেশ জুড়ে ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে তুলতে গেলে যেমন কংগ্রেসের হাত ধরা ছাড়া উপায় থাকে না, তেমনই পশ্চিমবঙ্গেও বামেদের তৃণমূলের পাশে গিয়েই দাঁড়াতে হয়।

বুদ্ধিমান রাজনীতিক হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বামেদের সেই ইঙ্গিত দিয়েই রেখেছেন। ত্রিপুরায় সিপিএমের পরাজয়ের দিন তো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কারভাবেই নিজের রাজনৈতিক কৌশল এবং ভবিষ্যতের ‘রোডম্যাপ’ বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সিপিএম বা বলা ভালো পশ্চিমবঙ্গ সিপিএম এখনও সেই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা স্বীকার করতে তৈরি নয়। সেইজন্যই বিমান বসুরা নবান্নে গিয়ে ফিসফ্রাই খেয়ে এলেও বীরভূমে দলের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি  রামচন্দ্র ডোমদের মাথা ফাঁটছে। সিপিএম এই দু’নৌকায় পা দিয়ে চলা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে তাদের জন্য সমুহ বিপদ।