অত:পর তিন তালাক থেকে রেহাই মিলবে?

নন্দ সিংহ বিস্তকে এতদিন কেউ চিনতেন না। চেনার কোনো কারণও ছিল না। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বাবা হওয়ার সুবাদে আপাতত এই ৮৪ বছরের বৃদ্ধ মিডিয়ার নজরে। এবং যোগী আদিত্যনাথের বাবা তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারেই বোমাটি ফাটিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি পরিস্কারই বলেছেন, তাঁর ছেলেকে লখনউয়ের কুর্শিতে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে যে মুসলমান মহিলাদের ভোট রয়েছে, তাঁদের ভুলে গেলে চলবে না। সেই মুসলিম মহিলারা কিন্তু উত্তরপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে ‘তিন তালাক’ এবং নারীর অধিকার বিষয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা করছে। অতএব, যোগী আদিত্যনাথের বাবা কিন্তু উত্তরপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য ‘এজেন্ডা’টা প্রথমেই ঠিক করে দিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের ফল বেরনোর পর থেকেই নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের ভোটে মুসলিম মহিলাদের একটা বড় অংশের ভোট বিজেপি পেয়েছে। এবং সেই মহিলারা পদ্মফুলে ছাপ দিয়েছেন ‘তিন তালাক’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুখ খোলার পর থেকেই। মুসলিম পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুসলিম মহিলাদের এই বিজেপিকে ভোট দেওয়া অনেকটা তৃণমূল শুরুর সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক শ্লোগানের মতই। ‘চুপ চাপ, ফুলে ছাপ’। পুরুষতন্ত্রের ওপর মুসলিম মহিলাদের যে ক্ষোভ, তারই বহিঃপ্রকাশ এই ‘কমল’-এ ছাপ মারা।

শুধুমাত্র এই টুকু বলার জন্য আমাকে ‘বিজেপির দালাল’ বা ‘আর এস এস-এর এজেন্ট’ তকমা লাগানোর জন্য অনেকেই মুখিয়ে থাকবেন। কিছু আসা যায় না! আমরা যারা মুসলিম মহিলারা ‘তিন তালাক’-এর বিরুদ্ধে লাগাতার দেশের বিভিন্ন জায়গায় সন্মেলন, কনভেনশন করে চলেছি, তারা জানি কোন অবস্থায় পৌঁছে উত্তরপ্রদেশের মুসলিম মহিলারা নরেন্দ্র মোদী কিংবা পদ্মফুলে আস্থা রেখেছেন। যোগী আদিত্যনাথ কি ধরনের বক্তৃতা দেন, বা মুসলিম মহিলাদের কবর থেকে তুলে এনে কি করার কথা বলেছিলেন, সব মাথায় রেখেও উত্তরপ্রদেশের ফলাফল ঘোষণার পরে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দেরাদুনে বসে তাঁর নিজের বাড়ি থেকে ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আনন্দ সিংহ বিস্ত পরিস্কার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি ছেলেকে বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সব পক্ষকে নিয়ে যোগী আদিত্যনাথকে চলতে হবে। সব ধর্মালম্বীদের আস্থা অর্জন করতে হবে, সকলের মন জয় করতে হবে।’ এই প্রসঙ্গেই যোগীজী-র বাবা বিশেষ করে বোরখার আড়ালে মুখ ঢাকা মহিলাদের প্রতি নজর দেওয়ার জন্য ‘ছেলে’ থুড়ি উত্তরপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন।

‘তিন তালাক’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চে শুনানি শুরু হওয়ার কথা আগামী ১১ মে। প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর, বিচারপতি এন ভি রামান্না এবং বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়-এর নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ ‘তিন তালাক’-এর আইনি দিকটাই বিবেচনা করবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। তার আগেই গত ফেব্রুয়ারি মাসে নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের কাছে ‘তিন তালাক’ বাতিল করার দাবি জানিয়ে হলফনামা পেশ করেছিল। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার চারটি প্রশ্নও তুলেছিল। সেই চারটি প্রশ্ন হচ্ছে— ১) সংবিধানের স্বীকৃত ধর্মচারণ ও ধর্মচারণের অধিকারের সঙ্গে তিন তালাক, নিকাহ্‌-হালালা ও বহু বিবাহ প্রথা সঙ্গতিপূর্ণ কিনা? ২) ধর্মচারণ ও ধর্মপ্রচারের অধিকার সংবিধানের স্বীকৃত সমনাধিকার, জীবনের অধিকারের মতো মৌলিক  বিষয়গুলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন কিনা? ৩) কোনো আইন সংবিধানের কাঠামোর সঙ্গে না মিললে তার সংবিধানেরই ১৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী খারিজ হয়ে যায়। কেন্দ্রের প্রশ্ন, তাহলে কি মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (মুসলিম পার্সোনাল ল) খারিজ হয়ে যাওয়া উচিত। ৪) মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে উল্লেখ থাকা প্রথাগুলি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে ভারতের দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য কিনা?

কেন্দ্রের হলফনামা পাওয়ার পরই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘তিন তালাক’ নিয়ে এই প্রশ্নগুলো সাংবিধানিক। তাই পাঁচ বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত সাংবিধানিক বেঞ্চ-ই এই বিষয়ে বিচার করবে। এবং সুপ্রিম কোর্টের এই বিচারের সঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানিবিধির কোনো সম্পর্ক নেই। সুপ্রিম কোর্ট কেবলমাত্র ‘তিন তালাক’ ‘নিকাহ্‌-হালালা’ এবং মুসলিম বহু বিবাহের আইনি বৈধতার দিকটি খতিয়ে দেখবে। সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আইনজীবীদের নিজেদের বক্তব্য জানানোর কথাও বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। নরেন্দ্র মোদীর সরকার যে ‘তিন তালাক’ তুলে দিতে চায়, সেই কথা উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনের জয়ের পর পরই বলেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। যোগী আদিত্যনাথের বাবার মন্তব্য আসলে বিজেপির সেই মনোভাবকেই আরও সামনে এনে দিয়েছে।

এর বিপরীতে একবার দেখে নেওয়া যাক ‘তিন তালাক’ প্রথা টিকিয়ে রাখার দাবিতে সবচেয়ে সোচ্চার ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড’ সুপ্রিম কোর্টে তাদের হলফনামায় ঠিক কি বলেছে। মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডও তাদের হলফনামায় তিন তালাক-এর সপক্ষে তিনটি প্রধান যুক্তি দিয়েছে। ১) ‘তিন তালাক’ থাকা উচিত, কারণ তা না হলে আদালতের মাধ্যমে মুসলিমদের বিবাহ বিচ্ছেদ হলে অনেক সময় লেগে যাবে। এবং যদি বিবাহ বিচ্ছেদে অনেক সময় লাগে, তাহলে মুসলিম পুরুষের মাথা গরম হতে পারে! এবং পুরুষের মাথা গরম হলে, তিনি আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি বিবাহ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মহিলাকে খুনও করে ফেলতে পারেন! অতএব, মুসলিম মহিলাদের শারীরিক সুরক্ষার স্বার্থেই ‘তিন তালাক’ থাকা প্রয়োজন। ২) যদি আদালতে গিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে হয়, তাহলে মুসলিম পুরুষ মুসলিম নারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনবে। সেই অভিযোগের মধ্যে মুসলিম নারীর চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন থাকবে। এহেন অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আদালতে চলতে থাকলে ওই মুসলিম নারীর ‘বেইজ্জতি’ হবে। পরবর্তীকালে ওই বিবাহবিচ্ছিন্না মুসলিম নারী অন্য স্বামীও খুঁজে পাবেন না! অতএব মুসলিম নারীর সম্ভ্রম রক্ষার জন্যই ‘তিন তালাক’ থাকা প্রয়োজন! ৩) জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবাহের ব্যাপারে যদি সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একজন পুরুষ নিতে পারে। কারণ, মুসলিম পুরুষ তো মুসলিম নারীর চেয়ে ‘বুদ্ধি’ ও ‘বিবেচনা’-য় অবশ্যই এগিয়ে!

মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড-এর সুপ্রিম কোর্টের দাখিল করা হলফনামাটা দেখলেই বোঝা যায়, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে তারা ‘তিন তালাক’ টিকিয়ে রাখার জন্য সাওয়াল করেছে। কতটা পুরুষতান্ত্রিক হলে এবং কতটা নারী-বিরোধী হলে মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এহেন যুক্তি সুপ্রিম কোর্টে পেশ করতে পারে। আবার উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে ফিরি। এবারের উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন আরও অনেক নতুন কিছু দিয়ে গিয়েছে। দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রাজ্যের এই ১৭ তম বিধানসভা এই প্রথম ৩৮ জন মহিলা বিধায়ক আসছেন, যা উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে সর্বকালীন রেকর্ড। এই ৩৮ জনের মধ্যে ৩২ জনই বিজেপির। কংগ্রেস এবং মায়াবতী-র বহুজন সমাজপার্টির ২ জন করে মহিলা বিধায়ক রয়েছেন। আর সমাজবাদি পার্টির এবং আপনা দলের একজন করে মহিলা বিধায়ক এই নতুন বিধানসভায় থাকবেন। নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড বলছে, স্বাধীনতার পরে এটাই উত্তরপ্রদেশের বিধানসভায় মহিলাদের সবচেয়ে বড় ‘টিম’। ১৯৫২-র নির্বাচনে যেখানে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভায় মাত্র ২০ জন মহিলা বিধায়ক ছিলেন, সেখানে এবারে প্রায় তার দ্বিগুণ সংখ্যায় পৌঁছে যাওয়াটা হয়তো বলে দেয় হিন্দি বলয়েও এখন ঠিক কোন ধরনের হাওয়া বইছে।

সংসদে কিংবা বিধানসভায় মহিলা প্রতিনিধি পাঠানোর ব্যাপারে সবচেয়ে কৃপণ সমাজবাদি পার্টি। অতীতে লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ বিলও পাশ হতে পারেনি যাদব কূলপতিদের ‘হাঙ্গামা’-র জন্য। পুরুষতন্ত্রের সোচ্চার সমর্থক সমাজবাদী পার্টি যে মুসলিম পুরুষতন্ত্রকেও পাশে পাওয়ার জন্য ‘তিন তালাক’ নিয়ে কোনও মুখ খোলেনি, তা আমরা সবাই জানি। উত্তরপ্রদেশের ভোটের ফলাফল জানিয়ে দিয়েছে, দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্যের মহিলারা ঠিক কি ভাবছে। সমাজবাদী পার্টির মতো আরও যে সব আঞ্চলিক দল মুসলিম পুরুষতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েই ‘তিন তালাক’-এর হয়ে সওয়াল করে চলেছে, তাদের বোধহয় এবার ভাববার সময় এসেছে। কারণ দেশের নির্বাচনী রাজনীতি অন্যদিকে বইছে।

সুপ্রিম কোর্ট কী রায় দেয়, সেই দিকে তাকিয়েই এখন গোটা দেশ। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্র করেই তো এখন যাবতীয় রাজনৈতিক উত্তাপ। তাই যোগী আদিত্যনাথ বোধহয় বাবা-র কথার সূত্র ধরেই মুসলিম মহিলাদের জন্য প্রথম কাজটা করে ফেলতে পারেন। ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা’-র উপর দেশের সেন্সর বোর্ড যে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে, তা তুলে নেওয়ার জন্য তিনি সেন্সর বোর্ডের প্রধান পহেলাজ নিহানলিকে অনুরোধ করতেই পারেন। বিজেপির-ই নিযুক্ত সেন্সর বোর্ডের প্রধান নিহানলি সাহেব কঙ্কণা সেনশর্মা, রত্না পাঠক শাহ অভিনীত এই ছবিটিকে ভারতে দেখানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কারণ মহিলা-কেন্দ্রীক এই সিনেমাটিতে নাকি যথেষ্ট উত্তেজক কথাবার্তা আছে। আসলে বোরখার আড়ালে থাকা মহিলাদের জীবনের চাহিদা, কামনা-বাসনা সবই তো এসেছে ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা’ সিনেমায়। যে বোরখাধারীদের সমর্থনে জিতে লখনউয়ের কুর্শিতে যোগী আদিত্যনাথ বসেছেন বলে তাঁর বাবাও মনে করেন, সেই বোরখাধারী মুসলিম মহিলাদের অধিকারের কথা কী ভাববেন না যোগী আদিত্যনাথ? বা নরেন্দ্র মোদী?