রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ভাবনা ও বঙ্গের স্বদেশী আন্দোলনের আলোকে আত্মনির্ভর ভারতর

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বছরের ১২ই মে যে আত্মনির্ভর ভারতের ডাক দিয়েছেন তা সব দিক থেকে ভারতবর্ষকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে নতুন ভারতবর্ষ গড়ার কথাও বলে। এই আত্মনির্ভর ভারতই করোনা-পরবর্তী বিশ্বে বিশ্বগুরু হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেছেন। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভারতীয় জনতা পার্টি যে আত্মনির্ভরতার ডাক দিয়েছে তা কিন্তু নতুন কিছু নয়। জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতবর্ষের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের আগে দলের ম্যানিফেস্টোতে ক্ষুদ্র-মাঝারি এবং কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে ভারতীয় জনগণের চাহিদা যাতে সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় শিল্পই মেটাতে পারে- তার কথা বলেন। তিনি আরও বলেন- ভারতীয় শিল্পের বিকাশের জন্য তাঁর দল স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার করতে মানুষকে উৎসাহী করবে এবং স্বদেশী ব্যবহারের জন্য জাতীয় চেতনার প্রসারে উদ্যোগী হবে।

পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ও তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে ও লেখায় বারংবার ভারতীয়দের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতার ‘স্পিরিট’ জাগানোর কথা বলেছিলেন। তিনি ‘self-esteem’ বা আত্মসম্মান জাগানোর কথা বারংবার বলতেন। দীনদয়াল উপাধ্যায় আরও বলতেন, আমাদের নিজেদের দেশের পরিচয় এতটাই নিজেদের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে, আমরা যদি বাইরে থেকে কোন জিনিস গ্রহণ করি, সেটাকেও আমরা যেন নিজেদের ছাঁচে ঢেলে নিতে পারি। পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টি গঠন হওয়ার পরও ১৯৮৫-র জুলাইয়ে দলের অর্থনৈতিক রেজলিউশনে আত্ম-নির্ভরশীলতার গুরুত্বের কথা তুলে ধরা হয়। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে জনসঙ্ঘ থেকে বিজেপির যাত্রাপথে তার আদর্শের মধ্যে চিরকালই আত্ম-নির্ভরশীলতার কথা ছিল।

আত্মনির্ভরশীল নতুন ভারত গঠনের অন্যতম উদাহরণ PPE (Personal Protection Equipment) তৈরিতে ভারতবর্ষের বিস্ময়জনক সাফল্য। ভারতবর্ষসহ গোটা বিশ্বেই করোনা সংকটের জন্য PPE-র চাহিদা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ মাসে গোটা ভারতবর্ষে কোন PPE তৈরি হত না এবং ভারতবর্ষের কাছে ছিল বিদেশ থেকে আমদানি করা মাত্র ২,৭৫,০০০ টি PPE। এই অবস্থা থেকে মাত্র দুই মাস পরে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে ভারতবর্ষে প্রত্যহ ৪,৫০,০০০ টি PPE তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে ভারতবর্ষ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম PPE নির্মাণকারী দেশ। কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছায় এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে বিভিন্ন সরকারী সংস্থার সঙ্গে কিছু বেসরকারি সংস্থা গাঁটছড়া বাঁধায়। আগের বছর গোটা বিশ্বে PPE-র মোট বাজারমূল্য ছিল ৫২.৭ বিলিয়ন ডলার। এটি ২০২৫-এ প্রায় ৯২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম PPE উৎপাদনকারী দেশ হিসাবে ভারতবর্ষ এই বাজারের একটি বড় অংশ দখল করবে বলেই আশা করা যায়।

আরেকটি এই ধরণের বিষয় হচ্ছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। মূলত ম্যালেরিয়া প্রতিহত করতে ব্যবহার হওয়া এই ওষুধটি প্রধানত ভারতেই তৈরি হয়। করোনা প্রতিরোধে এই ওষুধটির ভূমিকার কথা জানার পরে আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু দেশ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন পাওয়ার জন্য ভারতবর্ষের শরণাপন্ন হয়। ভারত এই ওষুধটির উৎপাদন বাড়িয়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ওষুধটি বিপুল পরিমাণে সরবরাহ করে। ‘টাইমস্ অফ ইন্ডিয়া’-র ৮ই জুনের একটি প্রবন্ধ অনুসারে ভারতবর্ষ এখনও পর্যন্ত ১৩৩ টির ওপর দেশে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ও প্যারাসেটামল অনুদান ও বাণিজ্যিক উভয়ভাবেই পাঠিয়েছে। মোট ৪৪৬ মিলিয়ন হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেট ও ১.৫৪ বিলিয়ন প্যারাসেটামল ট্যাবলেট এই দেশগুলিতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৭৬ টি দেশকে অনুদান হিসাবে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন দেওয়া হয়েছে। গোটা বিশ্বব্যাপী এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে মে মাসেই ভারতবর্ষে মাসিক ৩০০ মিলিয়ন (৩০ কোটি অর্থাৎ প্রতি দিন এক কোটি) হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন  ট্যাবলেট তৈরি করা হয়েছে। পৃথিবীর সবথেকে বড় মার্কেট রিসার্চ স্টোর ‘রিসার্চ এন্ড মার্কেটস্’ জানাচ্ছে যে, ২০১৮ তে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন-এর বিশ্বব্যাপী বাজারের পরিমাণ ছিল ৪১.৩ মিলিয়ন এবং সেটাই ২০২৭-এ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১০০.৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। আর এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভারতবর্ষে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন প্রস্তুতকারক ওষুধ নির্মাণকারী কোম্পানিগুলি বিপুল পরিমাণে লাভবান হবে।

ভারতীয় আত্মনির্ভরতার অন্যতম উদাহরণ হল তেজস যুদ্ধবিমান। ভারতীয় সংস্থা Aeronautical Development Agency (ADA)এবং Hindustan Aeronautics Limited (HAL) মিলিতভাবে এই ফোর্থ জেনারেশন ফাইটার জেট-টি তৈরি করেছে। অটল বিহারী বাজপেয়ীর জমানায় ২০০১ সালে প্রথম এই যুদ্ধবিমানটি আকাশে ওড়ে এবং ২০০৩-এ এর নাম দেওয়া হয় ‘তেজস’। তেজস মার্ক-২ বলে তেজসেরই আরেকটি উন্নত মডেল তৈরির কাজও চলছে। তেজস যেমন বানানো শুরু হয়েছিল রাশিয়ার মিগ-২১ এর পরিবর্ত হিসাবে; তেমনই তেজস মার্ক-২ রাশিয়ার মিগ-২৭, মিগ-২৯ এবং ফ্রান্সের মিরাজ-২০০০-এর পরিবর্ত হিসাবে কাজ করবে। ২০২৩-এর মধ্যেই তেজসের এই উন্নততর মডেল আকাশে উড়তে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই তেজসের বিভিন্ন মডেল কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ ভারতবর্ষ ক্রমশ অস্ত্র আমদানিকারি দেশ থেকে একটি স্বনির্ভর এবং অস্ত্র-রপ্তানিকারি দেশে পরিণত হচ্ছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই আত্ম-নির্ভরশীলতার ডাকের সঙ্গে আমরা মিল খুঁজে পাই বিংশ শতকের প্রথমে বাংলায় হওয়া বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ-র সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করেন। অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সারা বাংলায় এর বিরোধিতা শুরু হয়ে যায়। বাংলায় এই বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষে জাতীয়তাবোধের উত্থান ও দেশপ্রেমের বিকাশে এই স্বদেশী আন্দোলনের একটি বড় ভূমিকা ছিল। বিদেশী দ্রব্য বয়কট ও স্বদেশী আন্দোলন ভারতবর্ষে দেশীয় শিল্পোদ্যোগের বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছিল। জামশেদজী টাটা জামশেদপুরে ১৯০৭-এ টাটা আয়রন এন্ড স্টিল কোম্পানি লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন, প্রফুল্লচন্দ্র রায় মানিকতলায় বেঙ্গল কেমিক্যালের একটি নতুন শাখা স্থাপন করেন। স্বদেশীর প্রাণোচ্ছলতায় ঘোষিত হয় জাতীয় শিক্ষা নীতি। দিকে দিকে স্থাপিত হয় জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- এগুলির অনেক’কটিই এখন ভারতবর্ষের বিখ্যাত স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পরিণত হয়েছে।

রিসলের পত্র প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ১৯০৩ সাল থেকে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়। স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ‘গঠনমূলক স্বদেশী’। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল কংগ্রেসি নরমপন্থী নেতৃবৃন্দের ভিক্ষানীতি পরিত্যাগ করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া। এই নীতিরই ফলশ্রুতি বিভিন্ন স্থানে দেশীয় শিল্প স্থাপনের প্রয়াস, নীলরতন সরকারের ব্যবসায়ী উদ্যোগ এবং সতীশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ ঘোষণা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৪ সালে তাঁর বিখ্যাত ‘স্বদেশী সমাজ’ ভাষণে বাংলার চিরাচরিত গ্রাম সমাজের পুনরুত্থান ও পুনর্গঠনের ওপর জোর দেন। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার গ্রামে গ্রামে গঠিত হয় নানা সমিতি। ১৯০৭ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে এই ধরণের প্রায় ১০০০ টি সমিতি স্থাপিত হয়। এই সব সমিতির মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ছিল বরিশালে অশ্বিনীকুমার দত্ত স্থাপিত ‘স্বদেশ বান্ধব সমিতি’। এই ধরণের পদক্ষেপের মধ্যেই নিহিত ছিল ভবিষ্যতে গান্ধীর গ্রাম উন্নয়ন পরিকল্পনার বীজ।

নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানোর এই যে প্রচেষ্টা স্বদেশী আন্দোলনের মধ্যে বিকশিত হয়েছিল, তার অনুপ্রেরণা এসেছিল রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই। তিনি তাঁর বিভিন্ন কবিতা, রচনা ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বঙ্গভঙ্গের বেশ কিছুটা আগে থেকেই মানুষকে এই স্বনির্ভরশীলতার বাণী শুনিয়েছিলেন। পরনির্ভরশীলতা বিসর্জন দিয়ে তিনি মানুষকে আহ্বান জানালেন আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করতে। সেই সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য, শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের ব্যবধান মুছে দিতে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের কথাও বলেন। এইভাবে বঙ্গভঙ্গের আগে থেকেই বাংলায় স্বদেশীর ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। বস্তুত প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যালের মত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বঙ্গভঙ্গের আগেই গড়ে তোলা হয়েছিল। তবে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করেই এই স্বনির্ভরতা বা আত্মশক্তি পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হয়েছিল। সারা বাংলা জুড়ে স্বদেশীর ধুম পড়ে গিয়েছিল। কৃষ্ণকুমার মিত্র তাঁর ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় লেখেন- ‘‘স্বদেশে যে সকল দ্রব্য উৎপন্ন হয় ইংল্যান্ডের সে সকল দ্রব্য আমরা ব্যবহার করিব না। স্তবস্তুতি অনেক হইয়াছে, আর নয়। এখন আইস আমরা নিজের পদভরে দণ্ডায়মান হই।’’ সূতি কল, সাবান, দেশলাই, চামড়া প্রভৃতি নানা শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। তাঁত শিল্প ও নদী পরিবহনেও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মনে করতেন, আত্মশক্তির বিকাশে মঙ্গল আছে। এর ফলে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে, অশিক্ষিত ও দরিদ্রদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে, সমাজের সমস্ত শ্রেণীর মানুষ এর দ্বারা ঐক্যবদ্ধ হবে। রবীন্দ্রনাথের এই আত্মশক্তির বিকাশ বা গঠনমূলক স্বদেশী প্রফুল্লচন্দ্র রায়, নীলরতন সরকার, অম্বিকাচরণ উকিল, বিপ্রদাস পালচৌধুরী প্রমুখকে অনুপ্রাণিত করে এবং এরা প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে থেকে গঠনমূলক কাজকর্মের মধ্যে নিজেদের ব্যাপৃত রাখেন।

 এই স্বদেশী আবহেই ১৯০৬ সালে বাংলায় মহা ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয় ‘শিবাজী উৎসব’। এই উৎসবে যোগ দিতে বালগঙ্গাধর তিলক বাংলায় আসেন। এই উৎসবে প্রাচীন ভারতের গৌরবোজ্জ্বল হিন্দু ধর্ম ও সভ্যতার আদর্শ তুলে ধরা হয়। রাজপুত ও শিবাজীর মুক্তি সংগ্রামও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতা। 

স্বদেশী আন্দোলনের ফলে বাংলার সুমহান ও সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী কুটির শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল। এর মধ্যে বস্ত্রবয়ন শিল্পের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলনের ফলে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের রেশম শিল্পের আংশিক পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল। তাছাড়া কাঁসা ও পিতলের বাসন শিল্পেরও যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল। কাঞ্চননগরের ছুরি-কাঁচিরও সমাদর ছিল সর্বত্র। কুটির শিল্পের পাশাপাশি আধুনিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটেছিল। এ বিষয়ে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও জামসেদজি টাটা-র কথা আগেই বলা হয়েছে। এই স্বদেশী আন্দোলনের কালেই হয়েছিল বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের প্রতিষ্ঠা। এছাড়াও বহু নতুন কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯১০-এ সাইকেল শিল্পের গোড়াপত্তন করেন সুধীর কুমার সেন। শিল্পের পাশাপাশি ব্যাঙ্কিং, বীমা ও আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যেও স্বদেশী পুঁজি লগ্নি করা হয়। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক’। আর একটি উল্লেখযোগ্য স্বদেশী ব্যাঙ্ক ছিল ‘কো-অপারেটিভ হিন্দুস্থান’। ‘ন্যাশনাল ইনসিয়োরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’ (১৯০৬), ‘ইস্টার্ন লাইফ  ইনসিয়োরেন্স’ প্রভৃতি বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ববঙ্গের ভাগ্যকুলের রায় পরিবার ‘ইস্ট বেঙ্গল রিভার স্টিম সার্ভিস’ চালু করেন। স্বদেশী উদ্যোগে বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণের দিকেও নজর দেওয়া হয়েছিল। এইভাবে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন বাংলা ও তার বাইরেও সমগ্র ভারতবর্ষে প্রভাব বিস্তার করেছিল। 

এখানে আমরা দেখলাম প্রায় ১২০ বছর আগে বাংলায় যে স্বদেশী আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিল তা বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষে স্বদেশী শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের জোয়ার এনেছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং আত্মশক্তি-নির্ভর স্বদেশী সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছিলেন ১৯০৪ সালে। একইরকমভাবে বর্তমান ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী যে আত্মনির্ভর ভারতবর্ষের ডাক দিয়েছেন- তা যদি আমরা ভারতবাসীরা সফল করতে পারি- তাহলে সমগ্র ভারতবর্ষের চিত্রই পাল্টে যাবে। ভারতবর্ষ একটি তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ থেকে প্রথম বিশ্বের উন্নত দেশে পরিণত হবে। বর্তমান চীনা ভাইরাস বা করোনা ভাইরাসের ফলে সমগ্র বিশ্বে লকডাউন চলার ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতীয় অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। করোনা-পরবর্তী ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে বহু মানুষের কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা আছে। তো আমরা যদি স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার বাড়াতে পারি তাহলে স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো লাভবান হবে এবং চাকরি যাওয়া তো দুরের কথা- বরং বহু মানুষ চাকরি পাবেন। ফলে দেশের বেকারত্বের সমস্যারও অনেকটা সমাধান করা যাবে। বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ Angus Maddison তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The World Economy: Historical Statistics’-এ দেখাচ্ছেন যে ১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কিছু বছর বাদ দিলে ভারতবর্ষের GDP-ই ছিল বিশ্বে সর্বাধিক। প্রাচীন ও মধ্য যুগের ভারতবর্ষে খুব কম জিনিসই আমদানি করা হত এবং বিশ্বের বহু দেশে বহু ভারতীয় দ্রব্য রপ্তানী করা হত। পরিশেষে, এই আশাই রাখি যে আত্মশক্তিতে বলীয়ান নতুন ভারত আবার ‘‘জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’’।।।