ডিজিটাল আত্মনির্ভর ভারত গড়ার প্রয়োজনীয়তা

আমাদের দেশ সহ পুরো বিশ্ব যখন COVID19 এর বিরুদ্ধে লড়ছে ঠিক সেই সময়ে কমিউনিস্ট শাসিত চীনের আগ্রাসী নীতির ফলে আমাদের দেশের 20 জন বীর জওয়ানকে শহীদ হতে হল দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে গিয়ে।এই খবর অবশ্যই প্রতিটি দেশবাসীর হৃদয়ে গভীরভাবে আঘাত করেছে। একই ভাবে কমিউনিস্ট শাসিত চীনের মেরুকরণনীতি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে পুরো  বিশ্বের কাছে তা বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র উপলব্ধি করছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের সরকার ও সর্বোপরি দেশের অধিকাংশ জনগণ সমগ্র ক্ষেত্রে  চীনের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর পক্ষপাতী। হয়তো এরই ফল স্বরূপ আমাদের দেশের সরকার এরই মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ  নেওয়া  শুরু  করেছে তা চীনের কোম্পানির বরাত বাতিলের মাধ্যমেই হোক অথবা বহুল প্রচলিত কিছু চীনের মোবাইল অ্যাপস কে বন্ধ করার মাধ্যমে। অধিকাংশ দেশবাশী সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। কিছু নগন্য সংখ্যক চীনের দালাল যারা চীনের চেয়ারম্যানকে নিজেদের চেয়ারম্যান মনে করে, তারা অবশ্য এতে খুবই মর্মাহত।

এবার আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তুতে আসা যাক। চীনা ডিজিটাল প্লাটফর্ম আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য কতটা বিপদজনক তা আমরা বোঝার চেষ্টা করি।

ক্ষতিকারক দিকগুলি আলোচনা করার আগে আমাদের জানা উচিত এই আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর যুগে আমরা চীনের উপর কতটা নির্ভরশীল। একটি সমীক্ষায় বলছে যে ভারতে স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারী প্রতি তিন জন ব্যক্তির মধ্যে এক জন ব্যক্তির মোবাইলে সরকারের নিষিদ্ধ করা ৫৯টি অ্যাপস এর এক বা একাধিক অ্যাপস ইন্সটল ছিল। ৫৯ টি অ্যাপস এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচ্য অ্যাপস টি হল টিকটিক।  টিকটিক অ্যাপসটি সক্রিয় ভাবে ব্যবহারকারী ভারতীয়র সংখ্যা ছিল ১২ কোটি। ভারতের বাজারে বিক্রিত অধিকাংশ জনপ্রিয় মোবাইল ফোন কোম্পানী যেমন Xiomi, Oppo, Vivo, Oneplus, Realme চীনা ব্যক্তির মালিকানাধীন। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত ৫টি স্মার্টফোন কোম্পানির মধ্যে ৪টি চীনের। সবচেয়ে বেশি বাজার দখল করে আছে Xiomi প্রায় ৩১%, তারপরের স্থানটি হল Vivo প্রায় ২১%। চীনের কোম্পানি ZTE এবং Huawei এরা প্রধাণত মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা যেমন Airtel, Vodafone, Jio এদের telecommunication এর অধিকাংশ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। চীনের উপর আমাদের এই নির্ভরতা এক-দু দিন অথবা এক-দু বছরে তৈরি হয়নি, দীর্ঘদিনের systematic investmentএর ফলে চীন এই আধিপত্য তৈরি করেছে।

উপরের আলোচনা থেকে সহজেই অনুমেয় দৈনন্দিন জীবনে চীনের উপর আমাদের নির্ভরতা কতখানি। এখন আমাদের মতো সাধারন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে চীনের উপর আমাদের এই অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কতখানি বিপদের? আমাদের দেশের গরিব, নিম্নবৃত্ত, মধ্যবৃত্ত মানুষের, যারা হয়তবা সারা বছরের সঞ্চয় দিয়ে একটি smartphone কিনতে সামর্থ হয়েছেন, কি সত্যি সত্যি চিন্তিত হবার প্রয়োজন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সাম্প্রতিক অতীতের কিছু ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টিপাত করতে হয়। গত বছর  নভেম্বর মাসে California federal courtএ TikTokএর বিরুদ্ধে lawsuit file করা হয়েছিল এই অভিয়োগে যে গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করে তা চীনে পাঠানো হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি উন্নত দেশ চীনের company ZTE ও Huawei কে 5G technology এর bidding processএ অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছে অথবা বিরত রাখার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে। এই দুই কোম্পানীর বিরুদ্ধে অধিকাংশ দেশের অভিযোগ এই যে এই কোম্পানিগুলি তাদের দেশের critical telecom infrastructure এ trojan horses এবং spy হিসাবে কাজ করতে পারে এবং পুরো system এর উপর নজরদারি চালাতে পারে। ২০১৪ সালের প্রথমদিকে এরকমই একটি অভিযোগ করা হয়েছিল যে Huawei কোম্পানি BSNLএর networkকে hacked করেছে। এই ঘটনা ভারতের Parliamentএও আলোচিত হয়েছিল। চীনা web browser ‘UC browser’কে নিয়েও অতীতে আনেকবার অভিযোগ উঠেছে যে তারা গ্রাহকদের তথ্য চীনের serverএ স্থানান্তরিত করে এমনকি এই software uninstall করার পরেও তা গ্রাহকের DNS(Domain Name service) তথ্য সঞ্চয় করতে পারে অর্থাৎ গ্রাহক কোন কোন website খুলছে তা জানতে পারে। এরকম আরো হাজারো অভিযোগ আছে চীনের বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে।

এইসব ঘটনাবলির সাথেসাথে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা অবশ্যই প্রয়োজন, সেটি হল data localization এবং data security. সোজা ভাষায় বলতে গেলে data localization বলতে বোঝায় তথ্য কে স্থানীয় ভাবে সঞ্চয় করা অর্থাত আমাদের দেশে তৈরি হওয়া সমস্ত digital data কে দেশের মধ্যে server বানিয়ে সেখানে সঞ্চয় করে রাখা। আজকের দিন পর্যন্ত  চীনের কোম্পানি সহ প্রায় সমস্ত বিদেশি  কোম্পানি কিছু সংবেদনশীল banking payment সম্পর্কিত তথ্য ছাড়া বেশিরভাগ তথ্য সঞ্চয় করে ভারতের বাইরে অন্য দেশে অবস্থিত serverএ। এরকম আশঙ্কা করা হয় যে বিদেশের serverএ রাখা তথ্যকে কোম্পানিরা তাদের ব্যবসার সার্থে ব্যবহার করে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে 3rd partyএর সাথে ই তথ্য share করা হয়। যা সত্যিকারে আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের কাছে খুবই চিন্তার বিষয়। এর সাথেই  আসে data securityএর বিষয়। severএ সঞ্চিত তথ্য কতটা  secure বা নিরাপদ। সাধারনত তথ্যকে নিরাপদে রাখার জন্য encrypted formএ store করে রাখা হয় অর্থাৎ সোজা ভাষায় বলতে গেলে তথ্যকে lock করে রাখা হয়। যার কাছে এই lock খোলার key থাকবে একমাত্র সেই ঐ encrypted তথ্যকে decrypt করে প্রকৃত তথ্য উদ্ধার করতে পারে। তথ্যকে encrypted formatএ রাখার ফলে server থেকে তথ্য চুরি হলেও ঐ তথ্যকে decrypt করে আসল তথ্য উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। এখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগা সাভাবিক যে চীনের কোম্পানি গুলি সাধারন মানুষের যে সমস্ত ব্যক্তিগত এবং সংবেদনশীল তথ্য serverএ সঞ্চয় করে রেখেছে সেই তথ্য কতটা নিরাপদ। এই আশঙ্কা আরও গভীরতর হয় যখন আমরা জানতে পারি যে চীনের national intelligence law তে উল্লেখ আছে দেশের প্রয়োজনে সে দেশের কোম্পানি চীনা কমিউনিস্ট সরকারের সাথে তথ্য share করতে বাধ্য।

উপরের আলোচনা থেকে আমরা সহজেই এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে আমাদের মতো সাধারণ জনগণকে সমস্ত ধরনের চীনা ডিজিটাল প্লাটফর্ম যথা চীনা অ্যাপস, চীনা games, চীনা website, চীনা software  পুরোপুরি ভাবে বর্জন করতে হবে সাথে সাথে information technology, digital systems, electronics goods, telecommunication equipment এই সমস্ত  sectorএ চীনের উপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। এর ফলে আমারা চীনকে অর্থনৈতিক ভাবে ধাক্কা দিতে সক্ষম হব যা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং চীন তা খুব ভালোভাবে উপলদ্ধি করছে। কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত  মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাকে চীনের যন্ত্রাংশের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা BSNL 4G Upgradation এর জন্য সমস্ত চীনের যন্ত্রাংশের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে আমাদের দেশের FDI Policyতে পরিবর্তন এনেছে। এখন চীনের কোনো কম্পানি ভারতে FDI Policyএর মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে চাইলে তা কেন্দ্রীয় সরকারের সবুজ সঙ্কেত পাবার পরেই সম্ভব। আমাদের বিশ্বাস সরকার সঠিক সময়ে সঠিক  সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং আগামী দিনেও যথপোযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আমরা আশা করি সরকার data localization এবং data security এর মতো সংবেদনশীল বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে এবং সঠিক আইন প্রনয়ণের মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত করবে।